দীর্ঘ আট দশক ধরে বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটি শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয়ই হয়নি, বরং বৈশ্বিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলা, জোট সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন এবং নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু সেই দীর্ঘদিনের অবস্থান এখন বড় পরিবর্তনের মুখে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এমন একটি রাজনৈতিক মনোভাব শক্তিশালী হয়েছে, যেখানে অনেক নাগরিক মনে করেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা জোট এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দেশটি আগের মতো সুবিধা পাচ্ছে না। বরং আমেরিকার শক্তি ও সম্পদের সুবিধা অন্য দেশগুলো বেশি ভোগ করছে।
পরিবর্তনের পেছনের কারণ
এই মানসিকতার উত্থান হঠাৎ করে ঘটেনি। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর অনেক আমেরিকান নিজেদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। একই সময়ে চীনের দ্রুত উত্থানও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। অনেকের ধারণা তৈরি হয় যে, যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামো যুক্তরাষ্ট্র নিজেই গড়ে তুলেছিল, তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠছে অন্য শক্তিগুলো।
এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান ঘটে। তিনি এই অসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেন এবং আমেরিকার বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ককে আরও তীব্র করেন। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি ও অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকে।
মিত্রদের মধ্যে অনিশ্চয়তা
বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আগে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতিকে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হলেও এখন অনেক দেশ ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা, নিরাপত্তা সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় কিংবা অর্থনৈতিক চুক্তির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ফলে বহু দেশ নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
ইউরোপ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজছে। কানাডা রপ্তানি ও বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এমন সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যা কেবল ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল নয়।

ট্রাম্পের পরও কি বদলাবে পরিস্থিতি?
অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, বর্তমান অস্থিরতার কিছু অংশ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর কিছু সম্পর্ক পুনর্গঠন করা সম্ভব হতে পারে এবং মিত্রদের আস্থা আংশিকভাবে ফিরেও আসতে পারে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি আগের মতো বৈশ্বিক নেতৃত্বে ফিরবে? বিশ্লেষকদের ধারণা, সেই সম্ভাবনা এখন সীমিত। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা কমানোর প্রবণতা, সুরক্ষাবাদী অর্থনীতি এবং বিদেশে কম সম্পদ ব্যয়ের ধারণা এখন শুধু একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।
নতুন আমেরিকার বাস্তবতা
বিশ্বের অনেক দেশ এখনও নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু একই সময়ে আমেরিকার ভেতরে ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে এমন একটি জনমত, যারা মনে করে দেশের প্রধান মনোযোগ হওয়া উচিত অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও জাতীয় স্বার্থে।
ফলে আগামী বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় থাকলেও আগের মতো বৈশ্বিক নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। দেশটির ২৫০ বছরের ইতিহাসে এটি শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
বিশ্বনেতৃত্ব থেকে সরে এসে জাতীয় স্বার্থে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক রাজনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















