যৌবনে যাঁদের ক্ষুধা ছিল বেশ ভালো, তাঁদের অনেকেই ৬০ বছরের পর লক্ষ্য করেন—অল্প খেলেই পেট ভরে যাচ্ছে, আগের মতো আর খাওয়া হচ্ছে না। চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, এটি বার্ধক্যের একটি সাধারণ শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন। শরীরের হরমোন, পেশির পরিমাণ, স্বাদ-গন্ধ অনুভবের ক্ষমতা এবং সামাজিক অভ্যাস—সব মিলিয়ে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুধা কমে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান অধ্যাপক রজার এ. ফিল্ডিং বলেন, বিভিন্ন গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের দৈনিক ক্যালরি গ্রহণ তরুণদের তুলনায় গড়ে ১৬ থেকে ২০ শতাংশ কম।
ক্ষুধার সংকেত কেন দুর্বল হয়ে যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আসে। হিউস্টন মেথডিস্ট হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মার্গারেট ম্যানাস বলেন, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের শরীরে ‘ঘ্রেলিন’ নামের ক্ষুধা উদ্দীপক হরমোন তুলনামূলক কম উৎপন্ন হতে পারে। আবার একই পরিমাণ উৎপন্ন হলেও শরীর আগের মতো সাড়া নাও দিতে পারে। ফলে ক্ষুধার অনুভূতি কমে যায়।
অন্যদিকে ‘লেপ্টিন’ ও ‘কোলেসিস্টোকাইনিন’—যে দুটি হরমোন পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি করে—বয়সের সঙ্গে তাদের প্রভাব বাড়তে পারে। এর ফলে মানুষ কম খাবারেই তৃপ্তি অনুভব করে।
কিছু গবেষণায় আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, বয়স বাড়লে পাকস্থলী ধীরে খালি হয়। ফলে একবার খাওয়ার পর আবার ক্ষুধা লাগতে বেশি সময় লাগে।
পেশি কমে যাওয়ার প্রভাব
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের পেশির পরিমাণও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। পেশি চর্বির তুলনায় বেশি ক্যালরি খরচ করে। তাই শরীরে পেশি কমে গেলে শক্তির চাহিদাও কমে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই কম খাবারের প্রয়োজন হয়।
স্বাদ-গন্ধ কমে গেলে খাবারের আকর্ষণও কমে
পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান অধ্যাপক বারবারা রোলস বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকের স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করার ক্ষমতা কমে যায়। ২০২২ সালের একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, ৫০ বছরের বেশি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি স্বাদের সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার কথা জানান এবং প্রায় ৭০ শতাংশের গন্ধ শনাক্ত করার ক্ষমতা দুর্বল ছিল।
খাবারের স্বাদ বা গন্ধ আগের মতো না লাগলে খাওয়ার আগ্রহও কমে যায়। নেদারল্যান্ডসে ৩৫৯ জন বয়স্ক ব্যক্তির ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, যাঁরা স্বাদ কম অনুভব করেন বলে জানিয়েছেন, তাঁদের ক্ষুধাও তুলনামূলক কম ছিল।
একাকী খাওয়ার প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক বয়স্ক মানুষ একাই খাবার খান। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বসে খেলে মানুষ সাধারণত বেশি খাবার খায়। কারণ, একসঙ্গে খাওয়ার সময় খাবারের টেবিলে বেশি সময় কাটানো হয়, ফলে খাবারের পরিমাণও বাড়তে পারে।
ক্ষুধা বাড়াতে কী করা যেতে পারে
চিকিৎসকদের পরামর্শ, নিয়মিত শরীরচর্চা ক্ষুধা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম বা হালকা ওজন ব্যবহার করে অনুশীলন পেশি গঠনে সহায়তা করে, যা ক্যালরির চাহিদা বাড়ায় এবং ক্ষুধাও উদ্দীপিত করতে পারে।
যাঁদের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি, তাঁদের সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়। হালকা ডাম্বেল বা রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ব্যবহার করে বেশি সংখ্যক পুনরাবৃত্তির অনুশীলন উপকারী হতে পারে।
এ ছাড়া পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা জরুরি। ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য এবং চর্বিহীন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দিনে তিনবার বড় খাবারের বদলে চার বা পাঁচবার অল্প অল্প করে খাওয়াও অনেকের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
খাবারের স্বাদ বাড়াতে বিভিন্ন ভেষজ, মসলা, লেবুর রস বা ঝাল সস ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সুযোগ হলে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার অভ্যাসও ক্ষুধা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
বয়স বাড়লে ক্ষুধা কমে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের অংশ। তবে যদি ক্ষুধামন্দার সঙ্গে দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, অপুষ্টি বা অন্য শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে হরমোন, পেশি, স্বাদ-গন্ধ ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের কারণে ক্ষুধা কমতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ব্যায়াম, সুষম খাদ্য ও সামাজিকভাবে খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















