যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন প্রধান কেভিন ওয়ার্শ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। তবে চলতি মাসের বৈঠকে সুদহার বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত দেননি। তার ভাষায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পর্তুগালে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্মেলনে তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা কমেছে এবং বাজারও বুঝে গেছে যে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মূল্যস্ফীতিকে ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে দীর্ঘ সময় থাকতে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে সতর্ক অবস্থান
কেভিন ওয়ার্শ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার অঙ্গীকার থেকে সরে আসবে না। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি।
চলতি মাসের শেষ দিকে অনুষ্ঠিতব্য নীতিনির্ধারণী বৈঠকে সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত হবে আলোচনা ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
বাজারে অনিশ্চয়তা নিয়ে সমালোচনা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নীতি নিয়ে ওয়ার্শ তুলনামূলকভাবে কম কথা বলছেন। এতে কিছু অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নীতিগত দিকনির্দেশনা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
তবে ওয়ার্শ এই সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, বাজার পরিস্থিতিই প্রমাণ করছে যে বিনিয়োগকারীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন। সুদহারের ওঠানামা কমেছে, সরকারি বন্ডের আয় কমেছে এবং আগামী এক থেকে দুই বছরে মূল্যস্ফীতি কমবে—এমন প্রত্যাশাও বেড়েছে।

অর্থনীতির চিত্র বদলেছে
গত বছরের শেষ দিকে শ্রমবাজারে দুর্বলতার কারণে ধারাবাহিকভাবে সুদহার কমানো হয়েছিল। সে সময় মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানকে সহায়তা দেওয়াও ছিল অন্যতম লক্ষ্য।
কিন্তু চলতি বছরে পরিস্থিতি বদলেছে। কর্মসংস্থান আবার শক্তিশালী হয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারের উত্থান উচ্চ আয়ের মানুষের ব্যয় বাড়াতে সহায়তা করেছে।
এ অবস্থায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও অর্থনীতির শক্তিশালী গতি মূল্যচাপকে লক্ষ্যমাত্রার ওপরে ধরে রাখতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন নীতিনির্ধারক চলতি বছর সুদহার বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার মূল্যস্ফীতি বাড়াবে কি না—এ প্রশ্নে ওয়ার্শ সরাসরি উত্তর দেননি। তবে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রযুক্তি উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে পারে। যদি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আরও বেশি পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে পারে, তাহলে মূল্যচাপ কমানোর ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অটুট
ওয়ার্শ আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্বাহী বিভাগের বাইরে স্বাধীনভাবেই কাজ করে এবং ভবিষ্যতেও এই অবস্থান বজায় থাকবে। তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল অর্থনীতি নিশ্চিত করতে পারলেই রাজনৈতিক চাপ বা অন্য কোনো হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন হবে না।
নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও মতভেদ
সাম্প্রতিক বৈঠকে অংশ নেওয়া নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ভবিষ্যৎ সুদহার নিয়ে মতপার্থক্য দেখা গেছে। একাংশ মনে করছেন, অর্থনীতির বর্তমান গতি ও মূল্যচাপ বিবেচনায় সুদহার বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে। অন্য অংশের মত, আপাতত বর্তমান সুদহারই বজায় রাখা উচিত।
এদিকে বাজারের বড় একটি অংশ এখনো ধারণা করছে, চলতি মাসের বৈঠকে সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। তবে কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হলে সুদহার বৃদ্ধির আলোচনা আরও জোরালো হয়ে উঠতে পারে।
মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কমলেও সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী সিদ্ধান্ত শুধু দেশটির অর্থনীতিই নয়, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কমলেও সুদহার বাড়ানো হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে। বাজার এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















