যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র দুবাই। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর বাণিজ্য, পর্যটন, আবাসন ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে আমিরাতের এই নগররাষ্ট্র। তবে চলমান শান্তি আলোচনা স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করতে পারলে অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের ধাক্কায় থমকে যায় বাণিজ্য
সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার কনটেইনার দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের মাধ্যমে পরিবহন হতো। যুদ্ধের সময় সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র এক হাজারে। এখন বন্দর কর্তৃপক্ষ আগের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু বন্দরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
নিরাপদ শহরের ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে
দীর্ঘদিন ধরে দুবাইকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে নিরাপদ ও স্থিতিশীল ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে দেখা হতো। কম কর, আধুনিক জীবনযাত্রা এবং বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীরা এখানে বসতি গড়েছেন। বর্তমানে শহরের মোট জনসংখ্যার বড় অংশই প্রবাসী।
যুদ্ধ সেই নিরাপত্তার ধারণায় প্রথমবারের মতো বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অনেকেই সাময়িকভাবে শহর ছেড়ে গেলেও যুদ্ধবিরতির পর ধীরে ধীরে আবার ফিরতে শুরু করেছেন।
ধীরে ধীরে ফিরছে স্বাভাবিক জীবন
সংঘাতের সময় আতঙ্কে অনেক পরিবার বিদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তবে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর তারা আবার দুবাইয়ে ফিরে এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের চলমান প্রকল্প বন্ধ হয়নি, সামাজিক কর্মকাণ্ডও ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে।
যদিও নির্মাণ খাতে কিছুটা চাপ রয়েছে। বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা এটিকে সাময়িক সমস্যা হিসেবেই দেখছেন।

পর্যটন ও আবাসন বাজারে চাপ
যুদ্ধের পর হোটেলগুলোতে অতিথির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যুদ্ধের আগে রেকর্ড উচ্চতায় থাকা আবাসন বাজারও এখন অনেকটা স্থবির। কিছু বড় বিনিয়োগকারী অর্থ তুলে নিয়েছেন এবং নতুন বিনিয়োগের গতি কমেছে।
বিশেষ করে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই আবাসন কেনাবেচার যে বাজার ছিল, সেখানে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় পর্যটক কমে যাওয়ায় নতুন ক্রেতার সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে ভারত, রাশিয়া, চীন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিনিয়োগকারী কম দামে সম্পত্তি কেনার সুযোগ নিচ্ছেন। অনেক এলাকায় আবাসনের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
শান্তি স্থায়ী হলে বাড়বে বিনিয়োগের সম্ভাবনা
ব্যবসায়ীদের মতে, দুবাইয়ের অর্থনীতি বরাবরই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বিদেশি বাসিন্দাদের ওপর নির্ভরশীল। তাই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে পর্যটক, নতুন বাসিন্দা এবং বিনিয়োগকারীদের আগমন আবারও বাড়তে পারে। এতে আবাসন, পর্যটন ও বাণিজ্য খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
বিকল্প বন্দর দিচ্ছে স্বস্তি
জেবেল আলি বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দেশের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত অন্য কয়েকটি বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব বন্দরের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন অব্যাহত থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন স্বাভাবিক হতে শুরু করলেই বাড়তি জাহাজ ও পণ্য পরিবহনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
দুবাই এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার এবং স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা একসঙ্গে এগোচ্ছে। শান্তি আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র আবারও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
দুবাইয়ে যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। শান্তি আলোচনা সফল হলে বাণিজ্য, পর্যটন ও বিনিয়োগে নতুন গতি ফিরতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















