চীনের এক ভিডিও ব্লগারের ধারাবাহিক অভিযোগ দেশটির চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণা অঙ্গনে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবন্ধে তথ্য জালিয়াতির অভিযোগ তুলে তিনি একের পর এক ভিডিও প্রকাশ করছেন। এর জেরে দ্রুত তদন্ত শুরু হচ্ছে, শাস্তির মুখে পড়ছেন খ্যাতিমান গবেষকরা এবং নতুন করে প্রশ্ন উঠছে গবেষণার সততা নিয়ে।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সী গেং হংওয়েই উচ্চশিক্ষা শেষ করতে না পারলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর সংক্ষিপ্ত ভিডিওগুলো এখন চীনের গবেষণা মহলে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। একটি মাত্র ভিডিওই কোনো গবেষকের ক্যারিয়ারকে সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারছে।
তথ্য জালিয়াতির অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা
গত ১২ মে গেং একটি ভিডিওতে সাংহাইয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বিরুদ্ধে গবেষণার তথ্য জাল করার অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ প্রকাশের দিনই বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত শুরু করে। এক মাসের মধ্যেই তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর এক পোস্টডক্টরাল গবেষককে বরখাস্ত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধানকেও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এ ধরনের দ্রুত পদক্ষেপ চীনের গবেষণা অঙ্গনে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গেং দাবি করেন, তাঁর ভিডিও ঘিরে তৈরি হওয়া জনমতের চাপের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে।
নতুন অভিযোগেও তদন্ত
গত ২১ জুন প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে গেং ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই গবেষণায় শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাব্য একটি নতুন প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছিল।
ভিডিও প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত তদন্ত শুরু করার ঘোষণা দেয়। গবেষণাপত্রটির লেখকেরা তদন্তে সহযোগিতা করছেন বলে জানিয়েছেন, তবে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি।

গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ
গত কয়েক বছরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় চীনের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। দেশটির উদ্ভাবিত ওষুধ এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারেও পৌঁছাচ্ছে। ফলে গবেষণার তথ্যের সত্যতা নিয়ে ওঠা অভিযোগ শুধু চীনের নয়, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ক্রমবর্ধমান এসব অভিযোগ গবেষণা প্রকাশনা ও বৈজ্ঞানিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও নতুন করে নজর বাড়িয়েছে।
কেন বাড়ছে অনিয়ম?
গেংয়ের মতে, অনেক তরুণ গবেষক দ্রুত পদোন্নতি ও সাফল্যের আশায় অনৈতিক পথে হাঁটছেন। অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের একটি অংশ নিজেদের সাফল্যের রেকর্ড উজ্জ্বল রাখতে এসব অনিয়ম উপেক্ষা করছেন।
তাঁর বক্তব্য, গবেষণাগারের মূল তথ্য ও পরীক্ষার নথির জন্য প্রধান গবেষকদের সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীগুলোর ওপরও চাপ
গেংয়ের বেশিরভাগ অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবন্ধকে ঘিরে। তাঁর অভিযোগের পর অন্তত ছয়টি গবেষণাপত্রে সম্পাদকীয় পর্যায়ে তদন্তের নোট যুক্ত করা হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি।
এদিকে গত দুই মাসে গেংয়ের অভিযোগে চীনের অন্তত চারটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জ্যেষ্ঠ গবেষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
দ্রুত তদন্ত নাকি সতর্ক বিচার?
চীনে অভিযোগ ওঠার পর দ্রুত তদন্ত ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেলেও অনেক দেশে গবেষণা অনিয়মের তদন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলে। কারণ গবেষণাপত্রে একাধিক লেখক থাকায় ভুলটি ইচ্ছাকৃত ছিল নাকি অনিচ্ছাকৃত, দায় কার—এসব নির্ধারণ করতে সময় লাগে।
তবু গেং মনে করেন, গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপই সবচেয়ে কার্যকর। তাঁর ভাষায়, গতি নয়, জরুরিতার অনুভূতিই দুই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
গবেষণার সততা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং জবাবদিহি নিয়ে চীনে শুরু হওয়া এই বিতর্ক এখন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনেও গভীর আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
গবেষণায় তথ্য জালিয়াতির অভিযোগ তুলে এক ব্লগারের ভিডিওতে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক সততা নিয়ে নতুন বিতর্ক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















