মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তার জেরে বিশ্ববাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত অবসানে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক লাফে ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে বিক্রির চাপ বেড়েছে এবং সরকারি বন্ডের দামও কমে গেছে।
বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে দ্রুত সরে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে শুরু করায় বিশ্ববাজারে উদ্বেগ আরও বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তেলের বাজারে নতুন চাপ
আন্তর্জাতিক মানের ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারে পৌঁছেছে। যদিও সাম্প্রতিক সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখা ১২০ ডলারের বেশি দামের তুলনায় এটি অনেক কম, তবু এক দিনের এই বড় উল্লম্ফন বাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাসের সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত আগেই কমে এসেছে। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে কি না। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। সেখানে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের সরবরাহ নির্বিঘ্ন থাকলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দাম দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ
তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে বিশ্বের শেয়ারবাজারেও। ইউরোপের প্রধান শেয়ারসূচকগুলো বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের আগাম লেনদেনেও দুর্বলতার ইঙ্গিত মিলেছে।
বাজারে অস্থিরতার অন্যতম সূচক অস্থিরতা সূচকও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আগের তুলনায় অনেক বেশি।
বন্ড বাজারেও চাপ
শুধু শেয়ারবাজার নয়, সরকারি বন্ডের বাজারেও চাপ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ইতালির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ফলন এক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাধারণত বিনিয়োগকারীরা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে দেখলে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড বিক্রি করে থাকেন।

এদিকে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে ভবিষ্যতে সরবরাহে কোনো ধাক্কা এলে বাজার আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্বেগ
বিশ্ববাজারে প্রযুক্তি খাতেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং চিপ নির্মাতা কোম্পানিগুলোর মূল্যায়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাংয়ের শেয়ার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কমেছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধির তথ্য দিয়েছে, তবু বছরের দ্বিতীয়ার্ধে মেমোরি চিপের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট বাজারে মূল্য নির্ধারণ, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফলে প্রযুক্তি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্যায়নের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

মুদ্রাবাজারেও পরিবর্তন
বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মধ্যে ডলারের অবস্থানও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। ইউরোর বিপরীতে ডলারের মূল্য বেড়েছে, আর জাপানি ইয়েন দীর্ঘমেয়াদি নিম্নস্তরের কাছাকাছি অবস্থান করছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ বৈঠকের কার্যবিবরণীর দিকেও নজর রাখছেন, কারণ সেখান থেকে ভবিষ্যৎ সুদনীতি সম্পর্কে নতুন ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
বিশ্ববাজারে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার মধ্যে জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি আগামী দিনগুলোতে বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















