বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সাম্প্রতিক ভূমিধসে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু এবং তিন হাজারের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার সম্মিলিত ফল।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, প্রতি বর্ষায় রোহিঙ্গা শিবিরে প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে। পাহাড় কেটে গড়ে তোলা অস্থায়ী বসতি এবং ঢাল সুরক্ষায় অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
বর্ষায় বাড়ছে মানবিক সংকট
প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। অধিকাংশ পরিবার বাঁশ ও ত্রিপলের তৈরি অস্থায়ী ঘরে খাড়া, বন উজাড় করা পাহাড়ি ঢালে বসবাস করছে। বর্ষাকালে এসব এলাকা ভূমিধস, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মিয়ানমার থেকে নতুন করে রোহিঙ্গাদের আগমন অব্যাহত থাকায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) বারবার সতর্ক করে আসছে যে অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে শিবিরগুলোতে প্রাণহানির আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে ২৮৬টি আবহাওয়াজনিত ঘটনা ঘটে। এতে ২৬ হাজার ১১৯ জন শরণার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হন। এই সময়ে ৯৫টি ভূমিধসের ঘটনায় ৪ হাজার ৩০৭ জন বাস্তুচ্যুত হন, ২ হাজার ৮০৯টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৩টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
এছাড়া শিক্ষাকেন্দ্র, টয়লেট, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, রিটেইনিং ওয়াল, সড়ক, সেতু, সিঁড়ি ও চলাচলের পথও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নতুন আগতদের ঝুঁকি বেশি
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আসা রোহিঙ্গারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের জন্য আনুষ্ঠানিক আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে পাহাড়ের কিনারা বা অনিরাপদ স্থানে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ বা ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংস্থাটির সাক্ষাৎকারে এক রোহিঙ্গা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে আসার পর তিনি আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন এনজিওর কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু নতুনদের জন্য আশ্রয় বরাদ্দ না থাকায় তিনি নিজেই পাহাড়ের ধারে ঘর তৈরি করেন। ৬ জুলাইয়ের ভূমিধসে তার দুই মেয়ে ও দুই নাতি-নাতনির মৃত্যু হয়।
অবকাঠামো ও অর্থসংকট
একজন পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রকৌশলী এইচআরডব্লিউকে জানান, শুরু থেকেই পরিকল্পনাহীনভাবে পাহাড় কেটে শিবির নির্মাণ করা হয়েছিল এবং কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় টেকসই ভূমিধস প্রতিরোধমূলক কাজও যথাযথভাবে করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে স্থায়ী নির্মাণে সরকারি বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি শরণার্থীকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়েছে। তবে অনেকেই আশ্রয় হারানোর আশঙ্কায় স্থানান্তরে অনীহা প্রকাশ করছেন। তাছাড়া বিকল্প আশ্রয়কেন্দ্রেও পর্যাপ্ত গোপনীয়তা ও সেবার অভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন ত্রাণকর্মীরা।
অর্থায়নের ঘাটতি ও সুপারিশ
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার তুলনামূলক শক্তিশালী অস্থায়ী আশ্রয় নির্মাণ এবং আধা-স্থায়ী আশ্রয়ের কয়েকটি নকশা অনুমোদন করলেও ২০২৫ সালের শুরুতে মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় ৫০ হাজার আশ্রয় পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা থেমে যায়।
বর্তমানে আশ্রয় ও শিবির ব্যবস্থাপনা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৪২ শতাংশ জোগাড় হয়েছে। এখনও ৭ কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আরও ২ কোটি ৩২ লাখ ডলারের ঘাটতি রয়েছে।
এইচআরডব্লিউ এবং রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম আন্তর্জাতিক দাতাদের প্রতি ঢাল স্থিতিশীল করা, ড্রেনেজ উন্নয়ন, জলাধার ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ চলাচলের পথ নির্মাণ এবং দুর্যোগ-সহনশীল আশ্রয় তৈরিতে জরুরি অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, নিরাপদ আশ্রয়কে স্থায়ী বসতি হিসেবে নয়, বরং মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধসে ১৭ জন নিহত; এইচআরডব্লিউ বলছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বর্ষাকালে মানবিক ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















