একসময় যুদ্ধের অর্থ ছিল সীমান্তে সেনা সমাবেশ, গোলাবর্ষণ কিংবা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। এখন রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতা অনেক বেশি জটিল, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি তথ্য, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, কূটনীতি, সাইবার অবকাঠামো এবং জনমতের ওপর প্রভাব বিস্তার সমান গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই আধুনিক সংঘাতের আলোচনায় ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ ধারণাটি ক্রমশ কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
হাইব্রিড যুদ্ধকে অনেকেই সাম্প্রতিক ধারণা মনে করলেও এর বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি বহু পুরোনো। মার্কিন সামরিক গবেষক ফ্র্যাঙ্ক হফম্যান ২০০৬ সালে ধারণাটিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত ও জনপ্রিয় করেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, একটি রাষ্ট্র যখন প্রচলিত সামরিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপ, তথ্যযুদ্ধ, সাইবার অভিযান, অর্থনৈতিক কৌশল, অনিয়মিত যুদ্ধ এবং গোপন কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে, তখন সেটিই হাইব্রিড যুদ্ধের রূপ নেয়। লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষকে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই কৌশলগতভাবে দুর্বল করা।
এই চিন্তার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। প্রাচীন সামরিক দার্শনিকেরা বহু আগেই বুঝেছিলেন যে, প্রতিটি বিজয় যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয় না। চীনা সামরিক কৌশলবিদ সান জু লিখেছিলেন, যুদ্ধ না করেই প্রতিপক্ষকে বশে আনা সর্বোচ্চ কৌশল। আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর আচরণে সেই দর্শনের প্রতিফলন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এখন একটি দেশের অর্থনীতি, তথ্যব্যবস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কিংবা সামাজিক বিভাজনও সংঘাতের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক ও শিল্পক্ষমতা ছিল বিজয়ের প্রধান উপাদান। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের আবির্ভাব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনাকে অনেকটাই সীমিত করেছে। কারণ পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে অন্য পথে প্রবাহিত হয়েছে। প্রক্সি যুদ্ধ, সাইবার আক্রমণ, গোপন অভিযান, অর্থনৈতিক চাপ এবং তথ্যভিত্তিক প্রভাব বিস্তার আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়া একটি বিশেষ উদাহরণ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে পাকিস্তানের কাছে হাইব্রিড যুদ্ধ শুধু তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং একটি চলমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পারমাণবিক ভারসাম্য দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা কমালেও প্রতিযোগিতা থেমে নেই; বরং তা নতুন রূপে বিস্তৃত হয়েছে।
প্রবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক কৌশল প্রয়োগ করছে, যার মধ্যে রয়েছে কূটনৈতিক চাপ, তথ্যযুদ্ধ, সাইবার কার্যক্রম, অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন প্রক্সি নেটওয়ার্কের ব্যবহার। লেখকের মতে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের নিরাপত্তা-দর্শনে এই ধরনের কৌশলের প্রতিফলন দেখা যায়।

একই সঙ্গে লেখক অভিযোগ করেছেন যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদ, অস্থিতিশীলতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও এই বৃহত্তর হাইব্রিড সংঘাতের অংশ। কুলভূষণ যাদবের গ্রেপ্তার, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংকট এবং চীনা নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনাগুলোকে তিনি সেই দাবির পক্ষে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
লেখক আরও যুক্তি দিয়েছেন, বর্তমান সংঘাতে প্রাকৃতিক সম্পদও রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পানি প্রবাহকে কেন্দ্র করে যেকোনো রাজনৈতিক চাপ পাকিস্তানের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জলসম্পদ এখন শুধু পরিবেশগত নয়, নিরাপত্তাগত বিষয়ও।
হাইব্রিড যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্যের নিয়ন্ত্রণ। লেখকের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর প্রচারণা পরিচালিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২০ সালে ইইউ ডিসইনফোল্যাবের প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উল্লেখ করেছেন, যেখানে ভুয়া সংবাদমাধ্যম, সংগঠন এবং থিংক ট্যাঙ্কের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের তথ্য উঠে আসে।
প্রবন্ধে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতকে ঘিরে সাম্প্রতিক কিছু বহুল আলোচিত ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের দাবি, এসব ঘটনা রাষ্ট্র-সমর্থিত গোপন কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে বৈশ্বিক আলোচনার অংশে পরিণত করেছে।
তবে পুরো আলোচনার মূল বার্তা কেবল হুমকি চিহ্নিত করা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। লেখকের মতে, হাইব্রিড যুদ্ধ মোকাবিলা শুধু সেনাবাহিনীর দায়িত্ব হতে পারে না। কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা, দক্ষ গোয়েন্দা সমন্বয়, সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনসচেতনতা—এসব মিলেই একটি দেশের প্রকৃত প্রতিরক্ষা গড়ে ওঠে।
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের সংজ্ঞা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সীমান্তে গুলি না চললেও একটি রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অদৃশ্য আক্রমণের মুখে পড়তে পারে। তাই জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাও আর কেবল সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন তথ্য, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সমন্বিত সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
লেখকের মতে, পাকিস্তানের জন্য ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় রাখা। কারণ হাইব্রিড যুদ্ধের এই যুগে একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সামরিক সক্ষমতায় নয়, বরং বহুমাত্রিক চাপ মোকাবিলার সামগ্রিক স্থিতিস্থাপকতায় নিহিত।
আলি হামজা 



















