কোনো স্বৈরতন্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে কেবল বন্দুক, কারাগার কিংবা মৃত্যুদণ্ডের ওপর ভর করে টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাস দেখায়, ক্ষমতা যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তার কৌশলও তত বদলে যায়। স্পেনে ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর চার দশকের শাসন তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রথম পর্যায়ে ছিল নির্মম দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক প্রতিশোধ এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়ন; পরবর্তী পর্যায়ে সেই একই শাসনব্যবস্থা নিজেদের বৈধতা ধরে রাখতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সীমিত সাংস্কৃতিক ছাড় এবং সামাজিক সমঝোতার ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু এই পরিবর্তন স্বৈরতন্ত্রকে গণতান্ত্রিক করে তোলেনি; বরং তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার নতুন কৌশল তৈরি করেছিল।
কাতালোনিয়ার অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে বিশেষভাবে স্পষ্ট করে। গৃহযুদ্ধের পর বিজয়ী ফ্রাঙ্কো শাসন কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করেই থেমে থাকেনি; লক্ষ্য ছিল একটি বহুমাত্রিক জাতীয় পরিচয়কে একক স্প্যানিশ পরিচয়ের মধ্যে জোরপূর্বক আবদ্ধ করা। কাতালান ভাষা, সংস্কৃতি, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। ফলে প্রশাসনিক কাঠামো থেকে শুরু করে জনজীবনের প্রতিটি স্তরে কাতালান পরিচয়কে মুছে ফেলার প্রচেষ্টা চালানো হয়।
তবে এই দমননীতির প্রকৃতি বোঝার জন্য সংখ্যার চেয়ে কাঠামোর দিকে তাকানো জরুরি। কাতালোনিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা স্পেনের কিছু অন্য অঞ্চলের তুলনায় কম হলেও, তার অর্থ এই নয় যে সেখানে নিপীড়ন কম ছিল। বহু মানুষ গৃহযুদ্ধ শেষে সীমান্ত পেরিয়ে ফ্রান্সে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ফলে নির্বাসন, বাস্তুচ্যুতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও দমনের গুরুত্বপূর্ণ রূপে পরিণত হয়। অন্যদিকে যারা থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই রাজনৈতিক বিশ্বাস, শ্রমিক আন্দোলন, স্থানীয় প্রশাসন বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কারণে নির্যাতনের শিকার হন।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল কাতালান পরিচয়ের রাজনৈতিক শক্তিকে ভেঙে দেওয়া। ভাষা নিষিদ্ধ করা, রাস্তার নাম পরিবর্তন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়া—এসব ছিল একটি বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ। উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের বৈচিত্র্যের পরিবর্তে একমাত্রিক জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু সমাজকে প্রশাসনিক নির্দেশে বদলে ফেলা সহজ নয়। পরিবার, প্রতিবেশ এবং ব্যক্তিগত পরিসরে কাতালান ভাষা টিকে থাকে। মানুষ প্রকাশ্যে নীরব থাকলেও নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় পুরোপুরি ত্যাগ করেনি। এই নীরব ধারাবাহিকতাই পরবর্তী সময়ে কাতালান সংস্কৃতির পুনরুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে।
ষাটের দশকে এসে ফ্রাঙ্কো সরকার একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং আগের নীতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে। এই পরিবর্তিত পরিবেশে কেবল দমন-পীড়নের ভাষা যথেষ্ট ছিল না। শাসনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি এবং সীমিত সাংস্কৃতিক নমনীয়তার পথ বেছে নেওয়া হয়।
এই পর্যায়ে কাতালান ভাষা পুরোপুরি মুক্ত না হলেও আগের মতো সর্বাত্মক নিষিদ্ধ থাকেনি। কাতালান ভাষায় বই প্রকাশ, সাময়িকী প্রকাশনা কিংবা কিছু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে এসব ছাড়ের লক্ষ্য ছিল সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা নয়; বরং পরিচয়কে রাজনৈতিক শক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে লোকজ ঐতিহ্যের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা। যে সংস্কৃতি রাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে, তাকে রাষ্ট্র নিজেই নিয়ন্ত্রণের আওতায় এনে নিরাপদ সাংস্কৃতিক উপাদানে রূপান্তর করার চেষ্টা করে।
এই কৌশল স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য। প্রথমে যা নিষিদ্ধ করা হয়, পরে সেটিকেই আংশিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়—তবে এমনভাবে, যাতে তার রাজনৈতিক ধার ভোঁতা হয়ে যায়। সংস্কৃতি টিকে থাকে, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। ফ্রাঙ্কো শাসনের শেষ দুই দশকে কাতালোনিয়ায় এই দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

এ সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে কাতালান সমাজের ভেতরে। গৃহযুদ্ধের সময় যে বিভাজন ছিল গভীর, সময়ের সঙ্গে তার অনেকটাই বদলে যায়। শুরুতে সমাজের একটি অংশ ফ্রাঙ্কোকে সমর্থন করেছিল, কারণ তারা অরাজকতা ও বিপ্লবের আশঙ্কাকে আরও বড় বিপদ হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্বৈরশাসনের অভিজ্ঞতা অনেক পুরোনো সমর্থককেও পুনর্বিবেচনার দিকে ঠেলে দেয়। ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক অবস্থান ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা অতিক্রম করে নতুন ধরনের ঐক্যের ভিত্তি তৈরি হতে থাকে।
এই ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে কাতালোনিয়ার বিভিন্ন বিরোধী শক্তির সমন্বয়ে গঠিত আন্দোলন। কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, এমনকি ক্যাথলিক পরিমণ্ডলের অংশও ধীরে ধীরে একই দাবিতে একত্রিত হয়। কয়েক দশক আগে যাদের পারস্পরিক সহযোগিতা অকল্পনীয় ছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত সামাজিক জোট গড়ে তোলে। এই পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি ছিল একটি সমাজের আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া।
ফ্রাঙ্কো শাসনের ইতিহাস তাই কেবল দমন-পীড়নের ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতার অভিযোজন এবং সমাজের স্থিতিস্থাপকতার ইতিহাসও। রাষ্ট্র সহিংসতা দিয়ে ক্ষমতা দখল করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে গেলে তাকে নতুন ভাষা, নতুন কৌশল এবং নতুন বৈধতার উৎস খুঁজতে হয়। একই সঙ্গে সমাজও নীরব প্রতিরোধ, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা এবং বিস্তৃত ঐকমত্যের মাধ্যমে পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
কাতালোনিয়ার অভিজ্ঞতা আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো স্বৈরতন্ত্র যখন সীমিত স্বাধীনতা বা সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি দেয়, তখন সেটিকে কেবল উদারতার প্রকাশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। অনেক সময় সেটি হয় ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার হিসাবি কৌশল। আবার একই সঙ্গে এটিও সত্য যে সংস্কৃতি, ভাষা এবং সামাজিক সংহতি যদি মানুষের জীবনে গভীরভাবে প্রোথিত থাকে, তবে দীর্ঘতম দমননীতিও সেগুলোকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে না। ইতিহাসের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে সেই সমাজ, যে নিজের পরিচয়কে নিছক আবেগ নয়, বরং সম্মিলিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিতে রূপ দিতে সক্ষম হয়।
সিলিয়ান শিল্ডস 


















