ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং চীনের নতুন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এর ফলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো এশিয়ার প্রধান প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর কাছে হিলিয়ামের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুল্ক তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
হিলিয়াম সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগ্যাস। এটি কুলিং, লিক শনাক্তকরণ, গ্যাস ডিপোজিশন এবং উন্নত লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে সরবরাহে যেকোনো বিঘ্ন বৈশ্বিক চিপ শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন
এতদিন এশিয়ার প্রযুক্তি খাতের দেশগুলো মূলত কাতার ও চীন থেকে হিলিয়াম এবং অন্যান্য নিষ্ক্রিয় গ্যাস আমদানি করত। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাত কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও রপ্তানিতে প্রভাব ফেলেছে। যেহেতু কাতারে এলএনজি উৎপাদনের উপজাত হিসেবে হিলিয়াম উৎপাদিত হয়, তাই এলএনজি উৎপাদন কমে যাওয়ায় হিলিয়ামের সরবরাহও সংকুচিত হয়েছে।
অন্যদিকে, চীন কোনো কারণ উল্লেখ না করেই সাময়িকভাবে হিলিয়াম রপ্তানি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। এই দুই ঘটনার সম্মিলিত প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে নতুন চিত্র
২০২৫ সালে তাইওয়ানের মোট হিলিয়াম ও অন্যান্য নিষ্ক্রিয় গ্যাস আমদানির ৪ শতাংশেরও কম এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সেই হার বেড়ে প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে।
একই সময়ে কাতার থেকে আমদানির অংশ প্রায় ৮৮ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে প্রায় ৩০ শতাংশে। চীন থেকে আমদানির অংশ ছিল প্রায় ৫ শতাংশ।
দক্ষিণ কোরিয়াতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে দেশটির হিলিয়াম আমদানির ৫৫ শতাংশ এসেছিল কাতার থেকে। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ শতাংশে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বেড়ে প্রায় ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল প্রায় ২৮ শতাংশ।
চীন থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার আমদানি ২০২২ সালে অর্ধেকেরও বেশি থাকলেও ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশে।
জাপানেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ২০২২ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিরল গ্যাস আমদানির হার ছিল প্রায় ২৮ শতাংশ, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে তা বেড়ে ৮৩ শতাংশের বেশি হয়েছে। একই সময়ে চীন থেকে আমদানির অংশ প্রায় ২৮ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
চীনের পদক্ষেপে নতুন উদ্বেগ
শিল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, চীনের রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত দেশটির নিজস্ব হিলিয়াম সরবরাহও চাপের মধ্যে থাকার ইঙ্গিত দিতে পারে। ফলে দেশটি অভ্যন্তরীণ শিল্পের জন্য বেশি মজুত রাখতে চাইছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং বিরল মাটি, টাংস্টেনসহ বিভিন্ন কৌশলগত খনিজ ও শিল্প উপকরণের সরবরাহকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনা এবং ভূরাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। হিলিয়ামের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল দেখা যেতে পারে বলে শিল্প মহলের ধারণা।
বিশ্ববাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
বর্তমানে বৈশ্বিক হিলিয়াম উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কাতারের অবদান প্রায় ৩৩ শতাংশ এবং রাশিয়ার প্রায় ১০ শতাংশ। চীনের উৎপাদন ২ শতাংশেরও কম হলেও অতীতে এশিয়ার অনেক দেশ সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হিলিয়াম আমদানি করত।
এখন এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোর চীনের ওপর নির্ভরতা অনেক কমে এলেও রপ্তানি সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে হিলিয়ামের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সমিতি সরকারকে হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগ্যাস এবং এলএনজিসহ কৌশলগত জ্বালানির মজুত গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট মোকাবিলা করা যায়।
ইরান যুদ্ধ ও চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞায় বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহে বড় পরিবর্তন এসেছে। এতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















