বিশ্বখ্যাত অভিনেতা স্যাম নিল, যিনি ‘জুরাসিক পার্ক’, ‘দ্য পিয়ানো’সহ অসংখ্য আলোচিত চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, ৭৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, সোমবার অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পরিবারের দেওয়া বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যু ‘হঠাৎ এবং অপ্রত্যাশিত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, মৃত্যুর সময় তিনি ক্যানসারমুক্ত ছিলেন।
রোগের সঙ্গে লড়াই
২০২৩ সালে স্যাম নিল প্রকাশ করেছিলেন যে তিনি অ্যাঞ্জিওইমিউনোব্লাস্টিক টি-সেল লিম্ফোমায় আক্রান্ত হয়েছেন, যা নন-হজকিন লিম্ফোমার একটি বিরল ধরন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি ক্যানসারমুক্ত হন। পরিবারের ভাষ্য, জীবনের মতোই মর্যাদা বজায় রেখেই তিনি বিদায় নিয়েছেন।
হলিউডে দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় পথচলা
সত্তরের দশকের শেষ দিকে অস্ট্রেলীয় সিনেমার উত্থানের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান স্যাম নিল। স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র, হলিউডের বড় বাজেটের সিনেমা এবং টেলিভিশন নাটক—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন শক্তিশালী উপস্থিতি।
১৯৭৯ সালের ‘মাই ব্রিলিয়ান্ট ক্যারিয়ার’ এবং পরে ‘ডেড ক্যাল্ম’ চলচ্চিত্র তাঁকে বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে। এছাড়া ‘সুইট রিভেঞ্জ’, ‘দ্য পিয়ানো’, ‘ইভেন্ট হরাইজন’, ‘ওমেন থ্রি: দ্য ফাইনাল কনফ্লিক্ট’ এবং টিভি সিরিজ ‘দ্য টিউডরস’-এ তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
‘জুরাসিক পার্ক’-এর ড. অ্যালান গ্রান্ট
স্যাম নিলের সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্র নিঃসন্দেহে স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ১৯৯৩ সালের ব্লকবাস্টার ‘জুরাসিক পার্ক’-এর প্যালিওনটোলজিস্ট ড. অ্যালান গ্রান্ট। এই চরিত্রই তাঁকে বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে।
পরে তিনি ‘জুরাসিক পার্ক থ্রি’ (২০০১) এবং ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড: ডমিনিয়ন’ (২০২২)-এও একই চরিত্রে ফিরে আসেন।
টেলিভিশন ও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজ
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশনেও ছিল তাঁর সফল উপস্থিতি। ‘মার্লিন’ মিনিসিরিজে অভিনয়ের জন্য এবং ‘ওয়াইল্ড নিউজিল্যান্ড’ প্রামাণ্যধারাবাহিকে বর্ণনার জন্য তিনি এমি মনোনয়ন পান।
এছাড়া ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এ চেস্টার ক্যাম্পবেল, ‘স্যালি হেমিংস: অ্যান আমেরিকান ট্র্যাজেডি’-তে থমাস জেফারসন, ‘ইনভেশন’ এবং ২০২৪ সালের ‘অ্যাপলস নেভার ফল’-এ তাঁর অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
নিউজিল্যান্ড থেকে বিশ্বমঞ্চে
১৯৪৭ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডে নাইজেল নিল নামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সাত বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডে চলে যান। পরে স্কুলে একই নামে অনেক শিক্ষার্থী থাকায় নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘স্যাম’ রাখেন।
ডানেডিনে বেড়ে ওঠা নিল ১৯৭৭ সালের ‘স্লিপিং ডগস’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেন। এটি ছিল এক দশকেরও বেশি সময় পর নির্মিত নিউজিল্যান্ডের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

অভিনয়ের বাইরেও ছিলেন সফল
স্যাম নিল শুধু অভিনেতাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সফল আঙুরচাষি ও ওয়াইন প্রস্তুতকারকও। নিউজিল্যান্ডের সেন্ট্রাল ওটাগো অঞ্চলে তাঁর ‘টু প্যাডকস’ ব্র্যান্ডের অধীনে পিনো নোয়ার ও রিসলিং উৎপাদিত হতো।
২০২৩ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা Did I Ever Tell You This? পাঠকদের কাছেও সমাদৃত হয়। একই বছরে চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি নাইটহুড সম্মানে ভূষিত হন।
সরল জীবনযাপনের জন্যও তিনি ছিলেন পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের খামারের পশুপাখির ছবি নিয়মিত শেয়ার করতেন এবং সেগুলোর নাম রাখতেন তাঁর বিখ্যাত বন্ধু ও সহকর্মীদের নামে।
শ্রদ্ধা ও উত্তরাধিকার
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন তাঁকে দেশের অন্যতম সেরা শিল্পী হিসেবে অভিহিত করে বলেন, স্যাম নিল নিউজিল্যান্ডের গল্পকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২৩ সালের এক সাক্ষাৎকারে নিল বলেছিলেন, কঠিন সেই সময় তাঁকে জীবন, বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের মূল্য নতুন করে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে।
মৃত্যুকালে তিনি চার সন্তান ও আট নাতি-নাতনি রেখে গেছেন।
‘জুরাসিক পার্ক’-এর তারকা স্যাম নিল ৭৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা স্মরণ করছেন কিংবদন্তি এই অভিনেতার দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক কর্মজীবন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















