বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংকের তালিকায় চীনের একচেটিয়া আধিপত্য নিঃসন্দেহে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানকে কেবল শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ইতিহাস বলছে, ব্যাংকের আকার সবসময় স্থায়ী অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের নিশ্চয়তা দেয় না। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, আর্থিক অবকাঠামো, বৈশ্বিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ—এসবই ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই ভারতের জন্য প্রশ্নটি কেবল কেন তার কোনো ব্যাংক বিশ্বের শীর্ষ দশে নেই, তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, আগামী দশকগুলোর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তার আর্থিক সক্ষমতা কতটা প্রস্তুত।
১৯৯০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যাংকের তালিকার দিকে তাকালে জাপানের একচ্ছত্র আধিপত্য চোখে পড়ত। সে সময় মনে হয়েছিল, বৈশ্বিক আর্থিক ক্ষমতার কেন্দ্র স্থায়ীভাবে টোকিওতে সরে যাচ্ছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই জাপানের সম্পদ বুদ্বুদ ভেঙে পড়ে, আর শুরু হয় দীর্ঘ অর্থনৈতিক স্থবিরতার যুগ। অর্থাৎ, বড় ব্যাংক থাকা মানেই দীর্ঘস্থায়ী শক্তি নয়।
আজ একই ধরনের একটি দৃশ্য দেখা যাচ্ছে চীনকে ঘিরে। বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে সাতটিই এখন চীনের। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না (আইসিবিসি), চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক, এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না এবং ব্যাংক অব চায়না কয়েক বছর ধরেই শীর্ষ চারটি অবস্থান ধরে রেখেছে। নতুন করে পোস্টাল সেভিংস ব্যাংক অব চায়নার প্রবেশ দেখায় যে, দেশটির সঞ্চয়ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা কতটা বিস্তৃত ও শক্তিশালী।
তবে এই সাফল্যের পেছনের অর্থনৈতিক কাঠামো বোঝা আরও গুরুত্বপূর্ণ। চীনের প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে ব্যাংকঋণনির্ভর বিনিয়োগের মাধ্যমে। অবকাঠামো, রিয়েল এস্টেট ও শিল্প খাতে বিপুল ঋণ প্রবাহের কারণে দেশটির ব্যাংকগুলো বিশাল আকার ধারণ করেছে। বিপরীতে ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট, কারণ দেশটির অর্থনৈতিক মডেল এতটা ঋণনির্ভর নয়।
কিন্তু শুধু ব্যাংকের আকারই মূল বিষয় নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক অর্থ কোথা দিয়ে চলাচল করে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রকৃত ক্ষমতা ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে নয়, বরং অর্থ স্থানান্তরের অবকাঠামোয়। মার্কিন ডলারের আধিপত্য টিকে আছে কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের বড় অংশই ডলারে সম্পন্ন হয় এবং সেগুলো পরিচালিত হয় নিউইয়র্ককেন্দ্রিক ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সুইফট, যা বিশ্বের হাজার হাজার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের প্রধান নেটওয়ার্ক।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। ২০২২ সালে রাশিয়ার বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কার্যত অচল করে দেওয়া হয়েছিল কোনো সামরিক পদক্ষেপ ছাড়াই। এই ঘটনা বিশ্বের অনেক দেশের কাছে একটি নতুন বার্তা দেয়—যে অবকাঠামো অন্যের নিয়ন্ত্রণে, সেখানে আপনার সম্পদও শেষ পর্যন্ত অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
চীন এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। সে কারণেই দেশটি ধীরে ধীরে বিকল্প আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) সেই প্রচেষ্টার অন্যতম অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন আর্থিক কেন্দ্রে চীনা ব্যাংকের শাখা সম্প্রসারণ, রেনমিনবিতে আন্তর্জাতিক লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ এবং সীমান্তপারের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার পরীক্ষাও একই কৌশলের অংশ।

অবশ্য এটিকে এখনই ডলারের বিকল্প বলা যাবে না। বৈশ্বিক লেনদেনের খুব সামান্য অংশ এখনো রেনমিনবিতে হয় এবং সিআইপিএসের অনেক কার্যক্রমও সুইফটের ওপর নির্ভরশীল। তবু চীনের লক্ষ্য স্পষ্ট—সম্পূর্ণ বিকল্প তৈরি না হলেও অন্তত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা অচল না হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় ভারতের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াও বৈশ্বিক মানদণ্ডে অনেক পিছিয়ে। তিন দশকের বেশি সময় আগে এম. নারাসিমহাম কমিটি এমন কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক মানের ভারতীয় ব্যাংক গড়ে তোলার সুপারিশ করেছিল, যারা বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। পরে সরকারি ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ হলেও সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।
তবে ভারতের জন্য সমাধান কেবল ব্যাংককে বড় করা নয়। শুধু র্যাঙ্কিংয়ে ওপরে ওঠার জন্য মূলধন বাড়ানো অর্থহীন হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই মূলধন কী কাজে ব্যবহৃত হবে।

ভারত আগামী বছরগুলোতে বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ করতে চায়। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের সময় ভারত সহায়তা দিলেও তখন স্পষ্ট হয়েছিল, এ ধরনের সহায়তা টেকসইভাবে দিতে শক্তিশালী ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো বহু বছর ধরেই একই অঞ্চলে বড় আকারের অর্থায়ন করতে সক্ষম হয়েছে।
অর্থাৎ, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য শুধু কূটনীতি নয়, শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন। একইভাবে, নিজস্ব আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বও সীমিত থেকে যায়। ভারতের ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) বিদেশে সম্প্রসারণ এবং রুপিতে আন্তর্জাতিক লেনদেন বাড়ানোর প্রচেষ্টা সেই দীর্ঘ যাত্রার প্রাথমিক ধাপ মাত্র।
ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট। বড় ব্যাংক কখনো কখনো সফল অর্থনৈতিক মডেলের প্রতিফলন, আবার কখনো ভবিষ্যৎ সংকটেরও পূর্বাভাস। কিন্তু একটি বিষয় তুলনামূলকভাবে স্থায়ী—যে দেশ নিজের আর্থিক অবকাঠামো, লেনদেনের নেটওয়ার্ক এবং অর্থপ্রদানের পথ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তার অবস্থান অনেক বেশি নিরাপদ হয়।
ভারতের জন্য তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় বিশ্বের শীর্ষ দশ ব্যাংকের তালিকায় একটি নাম তোলা। বরং প্রয়োজন এমন ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা দেশের উন্নয়ন অর্থায়ন করতে সক্ষম, প্রতিবেশী অঞ্চলে কার্যকর আর্থিক ভূমিকা রাখতে পারে এবং এমন একটি পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলে, যার সুইচ অন্য কোনো দেশের হাতে থাকবে না। এটাই আগামী বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় প্রকৃত শক্তির ভিত্তি।
আদিত্য সিনহা 


















