০৪:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
 মুদ্রানীতি চার বছর পরও সংকোচনমুলক মুদ্রানীতি নিয়ে প্রশ্ন স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু জয়ে নয়, আধুনিক ফুটবলের নতুন সংজ্ঞায় স্পেনই এখন বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার, সম্ভাবনা প্রায় ৬২ শতাংশ স্পেনের প্রশংসায় টুখেল ও স্কালোনি, বিশ্বকাপে ‘সবচেয়ে পরিপূর্ণ’ দল বলে স্বীকৃতি স্পেনের দুর্ভেদ্য রক্ষণে ইতিহাস, উনাই সিমনের রেকর্ড ক্লিন শিটে বিশ্বকাপের ফাইনালে লা রোজা কুয়েতে নারী গৃহকর্মী পাঠাতে নতুন সতর্কবার্তা, নির্যাতনের শিকার আমিনাকে দেশে ফেরাল দূতাবাস শিক্ষার্থীদের লংমার্চ ঘিরে সায়েন্সল্যাবে কড়া নিরাপত্তা, পরীক্ষা শেষে বড় জমায়েত হয়নি ককরোচ জনতা পার্টি ও ভারতীয় মুসলমান: সংশয়ের রাজনীতি নাকি নেতৃত্ব গড়ার নতুন সুযোগ? সিলিকন ভ্যালিতে ছয় অঙ্কের বেতনেও স্বস্তি নেই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানে বাড়ছে জীবনযাত্রার চাপ অবহেলার দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে আলোচনায় নরওয়ের শিল্পী আস্তা নরেগার্ড, বিশেষ প্রদর্শনীতে ফিরল প্রাপ্য স্বীকৃতি

 মুদ্রানীতি চার বছর পরও সংকোচনমুলক মুদ্রানীতি নিয়ে প্রশ্ন

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আবারও কঠোর বা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আগের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নীতি সুদহার বাড়িয়েছিলেন। নতুন গভর্নরও সেটি বহাল রাখলেন। তবে নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ছয় মাসের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রাক্কলন আগের চেয়ে কমিয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া নতুন অর্থবছরের জন্য মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধের, অর্থাৎ আগামী জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য নতুন এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এতে নীতি সুদহার, ঋণের প্রবাহ, জিডিপির লক্ষ্যমাত্রাসহ ব্যাংক খাতের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়।

রাজধানীর মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয়ে মুদ্রানীতি প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান, নূরুন নাহারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক খাত, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে ড. হাবিবুর...

এ ছাড়া এসএলএফের নীতি সুদহার সাড়ে ১১ শতাংশ এবং এসডিএফের হার সাড়ে ৭ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এই দুই ধরনের সুদহার আন্তব্যাংক ধার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।

চার বছর পরও কেন সংকোচনমুলক মুদ্রানীতি – এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। তাই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখবে।

তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মে মাসে কমে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কঠোর নীতিগত অবস্থান বজায় রাখা হবে।

গভর্নর বলেন, বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা থেকে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেল ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য আমদানিনির্ভর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে।

এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা অনেক কমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি চার শতাংশের নেমে এসেছে। তাই আগের মুদ্রানীতির বেসরকারি খাতের সাড়ে ৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এ কারণে আগামী ছয় মাসের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

কঠোর মুদ্রানীতির বিপরীতে চার শতাংশ থেকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কীভাবে ৬.৮ শতাংশে এমন প্রশ্নে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এখান থেকে উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান সহজ শর্তে ঋণ নিতে পারবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করলে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে শেষ পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ১ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ কমাতে তিন পন্থায় এগোতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

খেলাপি কমাতে ১৮ মাসের পরিকল্পনা

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। যার আওতায় ব্যবসা পরিচালনায় সক্ষম কিন্তু আর্থিক সংকটে রয়েছে, এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি হচ্ছে অর্থঋণ আদালত আইন, যার মাধ্যমে অর্থঋণ আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি করা হবে।

একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি পালন করা হবে বলে জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, আগে হয়তো সর্বনিম্ন মাত্রার শাস্তি দেওয়া হতো, কিন্তু এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে।

গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহার ব্যবধান ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ব্যাংক খাতে একধরনের সমস্যা ছিল। তারপর আরেক ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। কিছু ব্যাংকের কাছে অনেক বেশি তারল্য। কেউ কেউ তার সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফা করছে। এ জন্য এই সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

বিদেশি ঋণ নেওয়া সহজ হবে

সংবাদ সম্মেলনে মেঘনা গ্রুপের বিদেশি ঋণ নেওয়ার উদ্যোগের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ‘আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণশীল ছিল। এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই কোনো উদ্যোক্তা যদি ৫ বা ৬ শতাংশ সুদে বিদেশি ঋণ আনতে পারেন, আমাদের নীতি হচ্ছে তাদের উৎসাহিত করা। আমরা দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বিদেশি ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে চাই। পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে মূল কোম্পানি থেকে ঋণ নেওয়ার অনুমতির বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।’

এ ছাড়া সিটি গ্রুপের বিষয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, সিটি গ্রুপের সমস্যাটি শুধু বিনিময় হারের কারণে হয়নি। সিটি গ্রুপের সঙ্গে ২৯টি ব্যাংক জড়িত। তাদের মধ্যে তিনটি শীর্ষ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সিটি গ্রুপের সমস্যা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা একসঙ্গে বসে কিছু সমাধান তৈরি করেছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়িত হলে সিটি গ্রুপ এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।

মূল্যস্ফীতি কী, জনজীবনে এর প্রভাব কী

তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, কঠোর মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতমুখী বাজেটের সুফল ম্লান হতে পারে। তাদের ভাষ্য, টানা চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিতভাবে নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। সদ্য অনুমোদিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক সুবিধা রাখা হয়েছে। তবে মুদ্রানীতিতে সেই প্রবৃদ্ধিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নেই, যা রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দেয়। তাই বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বেসরকারি খাতনির্ভর টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় এবং নীতিগত সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সাহসী পদক্ষেপ দরকার

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলছেন,  বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু নিয়ম মেনে মুদ্রানীতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; এটি কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। কেননা আর্থিক খাতের গভীর সংকট, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের বিস্তার ও কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলার স্পষ্ট উদ্যোগ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কয়েক বছর ধরেই দেখা গেছে, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অংশ মাত্র। সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট, জ্বালানির দাম, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ, এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সেলিম রায়হান বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি। কিন্তু এখনো বিনিয়োগে গতি আসেনি। নির্বাচনের পর কিছুটা আস্থা তৈরি হলেও জ্বালানিসংকট, লোডশেডিং ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। উল্টো রপ্তানি খাতেও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ কমার প্রবণতা উদ্বেগজনক। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, ইউরোপের চাহিদা কমে যাওয়া ও বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

মুদ্রানীতি সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

তিনি আরও বলেন, মুদ্রানীতিতে প্রণোদনা প্যাকেজের কথা আছে। কিন্তু তা কারা পাবে, কীভাবে নির্বাচন হবে ও রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে থেকে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি না, এসব প্রশ্ন থেকেই যায়। অতীতের ঋণখেলাপির সংস্কৃতি বিবেচনায় এই অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে যাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সেলিম রায়হান বলেন, বাজেটে করছাড় দিয়ে জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু করছাড়ের সুফল বাজারে ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, বাজারব্যবস্থায় প্রতিযোগিতাবিরোধী শক্তি শক্তিশালী। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু মুদ্রানীতি নয়; আর্থিক খাত, করব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সুস্পষ্ট ও সাহসী সংস্কার জরুরি। বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নীতি সুদ অপরিবর্তিত রাখা হতাশাজনক

ঘোষিত মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। টানা চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্খিতভাবে নিয়ন্ত্রণে আসেনি; বরং সর্বশেষ গত মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এমন এক পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা ব্যবসায়ীদের জন্য মোটেই ভালো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি বলেন, সরকার ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে সেই প্রবৃদ্ধিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান রাজনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত। উচ্চ নীতি সুদহার বহাল থাকায় ঋণের ব্যয় কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

ঢাকা চেম্বার সভাপতি বলেন, ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে গতি ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই তহবিলের সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ধ্বংসের ঝুঁকিতে থাকা শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা প্রদান আরও জরুরি। তাই আমি ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানাই।

তিনি বলেন, বাজেটে ঘোষিত রাজস্ব প্রণোদনা যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত না হলে সেসব উদ্যোগের কাঙ্খিত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না। তাই আমরা মনে করি, বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বেসরকারি খাতনির্ভর টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং নীতিগত সামঞ্জস্য অত্যন্ত জরুরি।

চাপে অর্থনীতি, আসছে বাজেট: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে নজর

মুদ্রানীতির কাজ কী

প্রতি বছর দুইবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একবার বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারিতে। আরেকবার  মুদ্রানীতি ঘোষণা হয় বছরের মাঝামাঝিতে অর্থাৎ জুলাইতে। মুদ্রানীতি অনেক পুরনো বিষয় হলেও অনেকেরই প্রশ্ন মুদ্রানীতির মাধ্যমে আসলে কী হয়। মুদ্রানীতির কাজটাই বা কী! এর উত্তরে বলা যায়, মুদ্রানীতি দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে।  তবে, মুদ্রানীতির আরেকটা কাজ হলো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। মূলত: বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে খোলাবাজার কার্যক্রম, সংবিধিবদ্ধ জমার অনুপাত পরিবর্তনসহ ব্যাংক হার পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতির অন্যতম কাজগুলো হলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা, ঋণের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি ঋণের যোগান ধার্য করা এবং মুদ্রার প্রচলন নিয়ন্ত্রণ করা।

প্রশ্ন আছে, মুদ্রানীতি সাধারণ মানুষের কী উপকারে আসে। উত্তরে বলা যায়, সাধারণ ভোগ্যপণ্যের দামস্তর বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিকে গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়। আগামী ছয় মাস বা একবছর দেশের জনসাধারণ ভালো থাকবে, নাকি খারাপ থাকবে তার একটা রূপরেখা থাকে মুদ্রানীতিতে। মুদ্রানীতির ‘টুল’ বা যন্ত্র দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহ (মানি সাপ্লাই) নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে জিনিসপত্রের দাম কম থাকবে, নাকি জিনিসপত্রের দাম বাড়বে  অথবা আগামী ছয় মাস বা একবছর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে নাকি ব্যয় কমবে, দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়বে, নাকি চাকরির সুযোগ তথা কর্মসংস্থান বাড়বে, দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি বাড়বে নাকি কমবে তার একটা রূপরেখা থাকে মুদ্রানীতিতে।

জনপ্রিয় সংবাদ

 মুদ্রানীতি চার বছর পরও সংকোচনমুলক মুদ্রানীতি নিয়ে প্রশ্ন

 মুদ্রানীতি চার বছর পরও সংকোচনমুলক মুদ্রানীতি নিয়ে প্রশ্ন

০৪:১০:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আবারও কঠোর বা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আগের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নীতি সুদহার বাড়িয়েছিলেন। নতুন গভর্নরও সেটি বহাল রাখলেন। তবে নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ছয় মাসের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রাক্কলন আগের চেয়ে কমিয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া নতুন অর্থবছরের জন্য মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধের, অর্থাৎ আগামী জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য নতুন এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এতে নীতি সুদহার, ঋণের প্রবাহ, জিডিপির লক্ষ্যমাত্রাসহ ব্যাংক খাতের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়।

রাজধানীর মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয়ে মুদ্রানীতি প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান, নূরুন নাহারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক খাত, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে ড. হাবিবুর...

এ ছাড়া এসএলএফের নীতি সুদহার সাড়ে ১১ শতাংশ এবং এসডিএফের হার সাড়ে ৭ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এই দুই ধরনের সুদহার আন্তব্যাংক ধার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।

চার বছর পরও কেন সংকোচনমুলক মুদ্রানীতি – এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। তাই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখবে।

তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মে মাসে কমে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কঠোর নীতিগত অবস্থান বজায় রাখা হবে।

গভর্নর বলেন, বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা থেকে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেল ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য আমদানিনির্ভর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে।

এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা অনেক কমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি চার শতাংশের নেমে এসেছে। তাই আগের মুদ্রানীতির বেসরকারি খাতের সাড়ে ৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এ কারণে আগামী ছয় মাসের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

কঠোর মুদ্রানীতির বিপরীতে চার শতাংশ থেকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কীভাবে ৬.৮ শতাংশে এমন প্রশ্নে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এখান থেকে উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান সহজ শর্তে ঋণ নিতে পারবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করলে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে শেষ পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ১ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ কমাতে তিন পন্থায় এগোতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

খেলাপি কমাতে ১৮ মাসের পরিকল্পনা

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। যার আওতায় ব্যবসা পরিচালনায় সক্ষম কিন্তু আর্থিক সংকটে রয়েছে, এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি হচ্ছে অর্থঋণ আদালত আইন, যার মাধ্যমে অর্থঋণ আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি করা হবে।

একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি পালন করা হবে বলে জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, আগে হয়তো সর্বনিম্ন মাত্রার শাস্তি দেওয়া হতো, কিন্তু এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে।

গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহার ব্যবধান ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ব্যাংক খাতে একধরনের সমস্যা ছিল। তারপর আরেক ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। কিছু ব্যাংকের কাছে অনেক বেশি তারল্য। কেউ কেউ তার সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফা করছে। এ জন্য এই সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

বিদেশি ঋণ নেওয়া সহজ হবে

সংবাদ সম্মেলনে মেঘনা গ্রুপের বিদেশি ঋণ নেওয়ার উদ্যোগের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ‘আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণশীল ছিল। এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই কোনো উদ্যোক্তা যদি ৫ বা ৬ শতাংশ সুদে বিদেশি ঋণ আনতে পারেন, আমাদের নীতি হচ্ছে তাদের উৎসাহিত করা। আমরা দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বিদেশি ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে চাই। পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে মূল কোম্পানি থেকে ঋণ নেওয়ার অনুমতির বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।’

এ ছাড়া সিটি গ্রুপের বিষয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, সিটি গ্রুপের সমস্যাটি শুধু বিনিময় হারের কারণে হয়নি। সিটি গ্রুপের সঙ্গে ২৯টি ব্যাংক জড়িত। তাদের মধ্যে তিনটি শীর্ষ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সিটি গ্রুপের সমস্যা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা একসঙ্গে বসে কিছু সমাধান তৈরি করেছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়িত হলে সিটি গ্রুপ এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।

মূল্যস্ফীতি কী, জনজীবনে এর প্রভাব কী

তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, কঠোর মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতমুখী বাজেটের সুফল ম্লান হতে পারে। তাদের ভাষ্য, টানা চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিতভাবে নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। সদ্য অনুমোদিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক সুবিধা রাখা হয়েছে। তবে মুদ্রানীতিতে সেই প্রবৃদ্ধিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নেই, যা রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দেয়। তাই বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বেসরকারি খাতনির্ভর টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় এবং নীতিগত সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সাহসী পদক্ষেপ দরকার

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলছেন,  বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু নিয়ম মেনে মুদ্রানীতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; এটি কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। কেননা আর্থিক খাতের গভীর সংকট, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের বিস্তার ও কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলার স্পষ্ট উদ্যোগ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কয়েক বছর ধরেই দেখা গেছে, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অংশ মাত্র। সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট, জ্বালানির দাম, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ, এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সেলিম রায়হান বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি। কিন্তু এখনো বিনিয়োগে গতি আসেনি। নির্বাচনের পর কিছুটা আস্থা তৈরি হলেও জ্বালানিসংকট, লোডশেডিং ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। উল্টো রপ্তানি খাতেও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ কমার প্রবণতা উদ্বেগজনক। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, ইউরোপের চাহিদা কমে যাওয়া ও বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

মুদ্রানীতি সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

তিনি আরও বলেন, মুদ্রানীতিতে প্রণোদনা প্যাকেজের কথা আছে। কিন্তু তা কারা পাবে, কীভাবে নির্বাচন হবে ও রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে থেকে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি না, এসব প্রশ্ন থেকেই যায়। অতীতের ঋণখেলাপির সংস্কৃতি বিবেচনায় এই অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে যাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সেলিম রায়হান বলেন, বাজেটে করছাড় দিয়ে জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু করছাড়ের সুফল বাজারে ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, বাজারব্যবস্থায় প্রতিযোগিতাবিরোধী শক্তি শক্তিশালী। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু মুদ্রানীতি নয়; আর্থিক খাত, করব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সুস্পষ্ট ও সাহসী সংস্কার জরুরি। বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নীতি সুদ অপরিবর্তিত রাখা হতাশাজনক

ঘোষিত মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। টানা চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্খিতভাবে নিয়ন্ত্রণে আসেনি; বরং সর্বশেষ গত মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এমন এক পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা ব্যবসায়ীদের জন্য মোটেই ভালো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি বলেন, সরকার ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে সেই প্রবৃদ্ধিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান রাজনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত। উচ্চ নীতি সুদহার বহাল থাকায় ঋণের ব্যয় কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

ঢাকা চেম্বার সভাপতি বলেন, ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে গতি ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই তহবিলের সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ধ্বংসের ঝুঁকিতে থাকা শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা প্রদান আরও জরুরি। তাই আমি ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানাই।

তিনি বলেন, বাজেটে ঘোষিত রাজস্ব প্রণোদনা যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত না হলে সেসব উদ্যোগের কাঙ্খিত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না। তাই আমরা মনে করি, বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বেসরকারি খাতনির্ভর টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং নীতিগত সামঞ্জস্য অত্যন্ত জরুরি।

চাপে অর্থনীতি, আসছে বাজেট: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে নজর

মুদ্রানীতির কাজ কী

প্রতি বছর দুইবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একবার বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারিতে। আরেকবার  মুদ্রানীতি ঘোষণা হয় বছরের মাঝামাঝিতে অর্থাৎ জুলাইতে। মুদ্রানীতি অনেক পুরনো বিষয় হলেও অনেকেরই প্রশ্ন মুদ্রানীতির মাধ্যমে আসলে কী হয়। মুদ্রানীতির কাজটাই বা কী! এর উত্তরে বলা যায়, মুদ্রানীতি দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে।  তবে, মুদ্রানীতির আরেকটা কাজ হলো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। মূলত: বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে খোলাবাজার কার্যক্রম, সংবিধিবদ্ধ জমার অনুপাত পরিবর্তনসহ ব্যাংক হার পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতির অন্যতম কাজগুলো হলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা, ঋণের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি ঋণের যোগান ধার্য করা এবং মুদ্রার প্রচলন নিয়ন্ত্রণ করা।

প্রশ্ন আছে, মুদ্রানীতি সাধারণ মানুষের কী উপকারে আসে। উত্তরে বলা যায়, সাধারণ ভোগ্যপণ্যের দামস্তর বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিকে গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়। আগামী ছয় মাস বা একবছর দেশের জনসাধারণ ভালো থাকবে, নাকি খারাপ থাকবে তার একটা রূপরেখা থাকে মুদ্রানীতিতে। মুদ্রানীতির ‘টুল’ বা যন্ত্র দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহ (মানি সাপ্লাই) নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে জিনিসপত্রের দাম কম থাকবে, নাকি জিনিসপত্রের দাম বাড়বে  অথবা আগামী ছয় মাস বা একবছর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে নাকি ব্যয় কমবে, দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়বে, নাকি চাকরির সুযোগ তথা কর্মসংস্থান বাড়বে, দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি বাড়বে নাকি কমবে তার একটা রূপরেখা থাকে মুদ্রানীতিতে।