কিংবদন্তি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটার, যিনি বহু বছর ধরে টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ডের অধিকারী ছিলেন, ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক গ্যারি (গারফিল্ড) সোবার্স ছিলেন ক্রিকেট ইতিহাসের এক বিরল প্রতিভা। তিনি সমান দক্ষতায় পেস, সুইং, অর্থোডক্স স্পিন এবং রিস্ট স্পিন—সব ধরনের বোলিং করতে পারতেন।
গ্যারি সোবার্সকে বিশ্বের সবচেয়ে পরিপূর্ণ অলরাউন্ডার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু ১৯৬৮ সালে ওয়েলসের সোয়ানসিতে তিনি এমন এক কীর্তি গড়েন, যা আগে কেউ করতে পারেননি। কাউন্টি ক্রিকেটে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামরগানের বিপক্ষে খেলতে নেমে তিনি এক ওভারে টানা ছয়টি ছক্কা হাঁকান। শেষ ছক্কাটি মাঠের বাইরে চলে যায় এবং পরে বলটি উদ্ধার হওয়াকে ঘিরে দীর্ঘ বিতর্কও সৃষ্টি হয়।
বিদেশি ক্রিকেটারদের কাউন্টি ক্রিকেটে খেলার অনুমতি দেওয়ার পর সোবার্স নটিংহ্যামশায়ারে যোগ দিয়েছিলেন। দলটির অধিনায়ক হিসেবে ওই ম্যাচে দ্রুত রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই গ্ল্যামরগানের বোলার ম্যালকম ন্যাশকে লক্ষ্য বানান। ন্যাশও সোবার্সের মতো মিডিয়াম পেস ও স্পিন—দুই ধরনের বোলিং করতে পারতেন, কিন্তু দক্ষতার বিচারে দুজনের মধ্যে ছিল বিশাল পার্থক্য।
পরে নিজের আত্মজীবনীতে সোবার্স লিখেছিলেন, বোলিং শুরুর আগে তিনি দুই সাবেক কিংবদন্তির পরামর্শের কথা মনে করেছিলেন। এভারটন উইকস বলতেন, ‘বল মাটিতে রাখলে কেউ ক্যাচ ধরতে পারবে না।’ আর স্যার লিয়ারি কনস্টানটাইন বলতেন, ‘বল যদি মাঠের বাইরে পাঠাও, তাহলে তো ধরারই সুযোগ থাকবে না।’ তবে শুরুতে তাঁর লক্ষ্য ছয় ছক্কা নয়, শুধু দ্রুত রান তোলা ছিল।
সোবার্স বুঝতে পেরেছিলেন, গোর্স লেনের লেগ সাইড বাউন্ডারি ছিল তুলনামূলক ছোট এবং ন্যাশের বাঁহাতি স্পিন খুব বেশি টার্ন করছিল না। প্রথম দুটি বলই তিনি সহজে সীমানার বাইরে পাঠান। তৃতীয়টি যায় মিড-অন দিয়ে, চতুর্থটি বোলারের মাথার ওপর দিয়ে গ্যালারিতে। তখনই তাঁর মনে হয়, ইতিহাস গড়া সম্ভব।

পঞ্চম বলটি তিনি ঠিকমতো টাইম করতে পারেননি। অফ স্টাম্পের বাইরের সেই বল বাউন্ডারির কাছে ফিল্ডার রজার ডেভিস ক্যাচ ধরলেও ভারসাম্য হারিয়ে সীমানার বাইরে পড়ে যান। ফলে সেটিও ছক্কা হিসেবে গণ্য হয়।
শেষ বলের আগে গ্ল্যামরগানের অধিনায়ক টনি লুইস পুরো বাউন্ডারিজুড়ে ফিল্ডার ছড়িয়ে দেন। ন্যাশ স্পিনের বদলে গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারতেন, কিন্তু সেটি করেননি। সোবার্স পরে বলেন, তিনি ধারণা করেছিলেন ন্যাশ তাঁকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দ্রুত গতির কিছুটা শর্ট বলটি তিনি স্ট্যান্ডের ওপর দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেন। টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার উইলফ উলার তখন উচ্ছ্বাসে বলে ওঠেন, ‘বলটি বাড়ির ওপর দিয়ে, বাসের ওপর দিয়ে, গিল্ডহলের দিকেও চলে গেছে!’
এই এক ওভারের ছয় ছক্কার কীর্তি নিয়ে সোবার্সকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ম্যালকম ন্যাশও একইভাবে সেই ঘটনার সঙ্গে চিরদিনের জন্য জড়িয়ে যান। নৈশভোজ, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বক্তৃতায় অংশ নেওয়া এবং বই লেখার মাধ্যমে সোবার্স এই ঘটনার স্মৃতি থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ উপার্জন করেছিলেন, যদিও তার বেশির ভাগই তিনি জুয়ায় হারিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে সেই ঐতিহাসিক বলটি ক্রিস্টিজ নিলামে ২৬ হাজার ৪০০ পাউন্ডে বিক্রি হয়। পরে সেটি আসল বল কি না, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। ন্যাশসহ অনেকে দাবি করেছিলেন, বিক্রি হওয়া বলটি আসল নয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সোবার্স এই ছয় ছক্কার গল্প বারবার বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ তাঁর ক্রিকেটজীবনে এর চেয়েও অসংখ্য অসাধারণ কীর্তি ছিল। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৬৫ রানের ইনিংস খেলে তিনি টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরের রেকর্ড গড়েছিলেন। সেই রেকর্ড ১৯৯৪ সালে আরেক বাঁহাতি ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা ভাঙেন। লারাকে সোবার্স অত্যন্ত সম্মান করতেন। তবু তাঁর অসংখ্য ভক্তের কাছে ছয় ছক্কার ঘটনাটিই সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকে। এ নিয়ে সোবার্স একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমি পৃথিবীর যেখানেই যাই, সবাই আমাকে এই ঘটনাটির কথাই জিজ্ঞেস করে।”
বার্বাডোজের এক বিস্ময় বালক
গারফিল্ড সেন্ট অবরান সোবার্স—যিনি ‘গ্যারি’ এবং ‘গ্যারি’ দুই নামেই পরিচিত ছিলেন—১৯৩৬ সালে বার্বাডোজের ব্রিজটাউনের সেন্ট মাইকেলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এক নাবিকের পঞ্চম সন্তান। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর বাবার জাহাজ টর্পেডোর আঘাতে ডুবে যায় এবং বাবা নিহত হন। এরপর তাঁর মা একাই ছয় সন্তানকে বড় করে তোলেন।

জন্মের সময় সোবার্সের দুই হাতেই একটি করে অতিরিক্ত আঙুল ছিল। শৈশবেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেগুলো অপসারণ করা হয়। তিনি ছিলেন সহজাত ক্রীড়াবিদ। ক্রিকেটের পাশাপাশি বাস্কেটবল, ফুটবল ও গলফেও বার্বাডোজের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি প্রায়ই বলতেন, সুযোগ পেলে তিনি ক্রিকেটার নয়, পেশাদার গলফার হতে চাইতেন। অবসরজীবনে গলফই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।
অন্যান্য ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ছেলেদের মতোই তিনি প্রথম ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন রাস্তায় কিংবা সমুদ্রসৈকতে, প্রায়ই টেনিস বল দিয়ে। বয়সের তুলনায় খাটো হলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি একজন সম্ভাবনাময় বোলার হিসেবে পরিচিতি পান। এটিই ছিল তাঁর একমাত্র আনুষ্ঠানিক শিক্ষা। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্কুল ক্রিকেট থেকে বড়দের ক্রিকেটে উঠে আসেন।
একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা উইলফ্রেড ফার্মার তাঁর প্রতিভা প্রথম লক্ষ্য করেন। সেই সময় বার্বাডোজের ক্রিকেট ব্যবস্থাপনা মূলত শ্বেতাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু সোবার্সের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি কখনও গায়ের রং বা জাতিগত বিভাজনকে গুরুত্ব দিতেন না।
১৬ বছরেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে
১৯৫৩ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, সোবার্স প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেন। ক্লাব ক্রিকেটে অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে ভারতীয় সফরকারী দলের বিপক্ষে বার্বাডোজের ম্যাচে তাঁকে প্রথমে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে রাখা হয়। কিন্তু ম্যাচের দিন সকালে এক বোলার ছিটকে গেলে সোবার্স মূল একাদশে সুযোগ পান।
প্রথম ইনিংসে তিনি ৫০ রানে চারটি এবং দ্বিতীয় ইনিংসে টানা ৬৭ ওভার বোলিং করে ৯২ রানে তিনটি উইকেট নেন। সেই পারফরম্যান্সই তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দরজা খুলে দেয়।
টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক এবং ব্যাটসম্যান হিসেবে উত্থান
১৯৫৪ সালের মার্চে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট দলে ডাক পান সোবার্স। তখন তিনি মূলত বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থোডক্স স্পিনের পাশাপাশি হাতের পেছন দিক ব্যবহার করে বল ঘোরানোর বিশেষ কৌশলও তিনি পরে রপ্ত করেন। ব্যাটিং করতেন নয় নম্বরে।

টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর প্রথম শিকার ছিলেন ইংল্যান্ডের দৃঢ়চেতা ব্যাটার ট্রেভর বেইলি। ইংল্যান্ডের ৪১৪ রানের ইনিংসে তিনি ৭৫ রানে চারটি উইকেট নেন। পরের মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া প্রথমবারের মতো ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে এলে কিশোর সোবার্স বল হাতে খুব বেশি সাফল্য না পেলেও ব্যাট হাতে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেন। চতুর্থ টেস্টে ওপেনিংয়ে নেমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন।
৩৬৫*—যে ইনিংস বদলে দিয়েছিল ইতিহাস
১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর টেস্ট ক্রিকেট খেলেও সোবার্স শতকের দেখা পাননি। কিন্তু এরপর তিনি এমনভাবে সেই আক্ষেপ ঘোচান, যা ক্রিকেট ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে পাকিস্তানের বিপক্ষে জ্যামাইকায় তিনি টানা দশ ঘণ্টা ব্যাট করে অপরাজিত ৩৬৫ রান করেন। তুলনামূলক দুর্বল বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে হলেও এটি ছিল অসাধারণ ধৈর্য, দক্ষতা ও মনোযোগের এক অনন্য প্রদর্শনী। এই ইনিংসই তাঁকে টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরের নতুন রেকর্ডের মালিক বানায়।
পরের ম্যাচে তিনি করেন ১২৫ ও অপরাজিত ১০৯ রান। এক বছর পর ভারতের মাটিতে টানা তিন টেস্টে খেলেন অপরাজিত ১৪২, রানআউট হওয়ার আগে ১৯৮ এবং অপরাজিত ১০৬ রানের ইনিংস।
শুধু প্রতিভা নয়, ছিলেন একজন ভদ্র ক্রিকেটার
এ সময়ের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, সোবার্স কেবল অসাধারণ প্রতিভাবান নন, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ছিলেন অত্যন্ত পরিপূর্ণ একজন ব্যাটার। তিনি সব সময় ইতিবাচক ও আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতেন।
তাঁর আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা। কম প্রতিভাবান সতীর্থদের প্রতি তিনি ছিলেন উদার, প্রতিপক্ষের প্রতিও দেখাতেন সম্মান। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা কিংবা প্রতিপক্ষকে গালিগালাজ বা মনোযোগ নষ্ট করার মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার ধারণা তাঁর কাছে ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। বাউন্সে ধরা বলকে ক্যাচ দাবি করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে বিরক্তিকর রক্ষণাত্মক ক্রিকেট খেলাও তাঁর স্বভাবের সঙ্গে মানানসই ছিল না।

জুয়ার নেশা ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি
তবে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিকও ছিল। বিশেষ করে ঘোড়দৌড়ের ওপর বাজি ধরার প্রবল নেশা ছিল তাঁর। সে সময় টেস্ট ক্রিকেটাররা আজকের মতো বিপুল পারিশ্রমিক বা স্পনসরশিপ পেতেন না। ফলে অর্থকষ্ট তাঁর জীবনের নিয়মিত সঙ্গী হয়ে ওঠে।
অবসরের পর বার্বাডোজ সরকার তাঁর দেখভালের দায়িত্ব নেয়। বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তিনি একটি সাধারণ বাংলোতে বসবাস করতেন। দীর্ঘদিন বার্বাডোজ ট্যুরিজম অথরিটির জনসংযোগ বিভাগে কাজ করেন। তবে অনেক সাবেক ক্রিকেটারেরই মনে হতো, তাঁর মতো কিংবদন্তির জন্য এমন চাকরি কিছুটা মর্যাদাহানিকর।
১৯৫৯ সালের একটি সড়ক দুর্ঘটনার স্মৃতি তাঁকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়ায়। তখন তিনি ইংল্যান্ডের সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে র্যাডক্লিফের হয়ে খেলছিলেন। একটি দাতব্য ম্যাচে অংশ নিতে লন্ডনে যাওয়ার পথে তাঁর গাড়ির সঙ্গে একটি লরির সংঘর্ষ হয়। গাড়িতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন দুই টেস্ট ক্রিকেটার টম ডিউডনি ও কলি স্মিথ। দুর্ঘটনায় কলি স্মিথ হাসপাতালে মারা যান। সোবার্স শারীরিকভাবে অক্ষত থাকলেও সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজনকে হারানোর সেই শোক তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। এরপর ঘোড়দৌড়ে বাজি ধরা এবং মদ্যপান—দুটিই বেড়ে যায় তাঁর জীবনে।
তবুও মাঠের পারফরম্যান্সে তার প্রভাব খুব একটা পড়েনি। ১৯৭৩ সালে লর্ডসে নিজের শেষ টেস্টে তিনি দুর্দান্ত এক অপরাজিত শতক করেন। তবে আগের রাতভর না ঘুমানোর কারণে ইনিংসের মাঝপথে তাঁকে কিছু সময়ের জন্য মাঠ ছাড়তে হয়েছিল।
কিংবদন্তি সিরিজ, অসাধারণ নেতৃত্ব
১৯৬০ সালে ইংল্যান্ড দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে এলে সোবার্স ব্যাট হাতে একের পর এক অসাধারণ ইনিংস খেলেন। প্রথম টেস্টে করেন ২২৬ রান, তৃতীয় টেস্টে ১৪৭, চতুর্থ টেস্টে ১৪৫ এবং পঞ্চম টেস্টে ৯২ রান।

এরপর অস্ট্রেলিয়া সফরে অংশ নেন, যা ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় সিরিজ হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত ‘টাইড টেস্ট’-এ তিনি ঝড়ো গতিতে ১৩২ রান করেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রতি তাঁর আজীবন বিশেষ টান ছিল। পরে তিনি একজন অস্ট্রেলীয় নারীকে বিয়েও করেন।
এক দশক পর অস্ট্রেলিয়ায় রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড একাদশের হয়ে তাঁর ২৫৪ রানের ইনিংসকে স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলা সর্বকালের সেরা ইনিংসগুলোর একটি বলে অভিহিত করেছিলেন।
বল হাতেও তিনি ছিলেন সমান ভয়ংকর। নতুন বল হাতে পেস বোলিং, পরে স্পিন—একই ম্যাচে যেন চারজন ভিন্ন বোলারের কাজ একাই করতে পারতেন। এর সঙ্গে ছিল দুর্দান্ত ফিল্ডিং, বিশেষ করে ব্যাকওয়ার্ড শর্ট লেগে।
অধিনায়ক হিসেবে নতুন যুগের সূচনা
১৯৬৩ সালে ইংল্যান্ড সফর শেষে কিংবদন্তি ফ্র্যাঙ্ক ওয়ারেলের উত্তরসূরি হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক হন সোবার্স। অনেকের আশঙ্কা ছিল, নেতৃত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব তাঁর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটা।
তাঁর নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জেতে। ভারত ও ইংল্যান্ডেও আসে সিরিজ সাফল্য।
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে তিনি পাঁচ টেস্টে ৭২২ রান করেন, যার মধ্যে ছিল তিনটি শতক। পাশাপাশি ২০টি উইকেটও নেন। দ্রুতগতির সুইং বোলিং দিয়ে ইংল্যান্ডের ওপেনার জিওফ্রে বয়কটকে একাধিকবার বিপাকে ফেলেন। ব্যাট, বল ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই তিনি ছিলেন ম্যাচজয়ী।
রেকর্ড নয়, দলের জন্য খেলতেন
সোবার্স মোট ৩৯টি টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নেতৃত্ব দেন। উইকেটের দিকে তাঁর স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে হাঁটার ধরন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অসংখ্য শিশুরা অনুকরণ করত। হাতার বোতাম লাগানো, কলার তুলে ধীর অথচ আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে ক্রিজে যাওয়া ছিল তাঁর পরিচিত দৃশ্য।
তিনি কখনও ব্যক্তিগত রেকর্ডের জন্য খেলেননি; খেলেছেন দলের জন্য। তবু রেকর্ড যেন নিজেই এসে ধরা দিয়েছে তাঁর হাতে।
১৯৭৪ সালে অবসরের সময় টেস্ট ক্রিকেটে সর্বাধিক রান এবং সর্বাধিক শতকের মালিক ছিলেন তিনি। টানা ৮৫টি টেস্ট খেলার রেকর্ডও তখন তাঁর দখলে ছিল।

পরিসংখ্যানেও অনন্য
৩৮ বছর বয়সে হাঁটুর চোটের কারণে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নেন।
অবসরের সময় তাঁর টেস্ট পরিসংখ্যান ছিল ঈর্ষণীয়—
- ৮,০৩২ রান
- ২৬টি শতক
- গড় প্রায় ৫৮
- ২৩৫টি উইকেট
- ১০৯টি ক্যাচ
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনি করেন ২৮,৩১৪ রান এবং নেন ১,০৪৩টি উইকেট।
পরবর্তীকালে তাঁর অনেক রেকর্ড ভেঙে গেছে, কিন্তু সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর অবস্থানকে খুব কম ক্রিকেটারই সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছেন।
১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্বাডোজ সফরকালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।
পরিবার, বিচ্ছেদ ও পরবর্তী জীবন
১৯৬৯ সালে ইংল্যান্ডে পরিচয় হওয়া অস্ট্রেলিয়ান নারী প্রুডেন্স কিরবিকে বিয়ে করেন গারফিল্ড সোবার্স। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই ছেলে—ম্যাথিউ ও ড্যানিয়েল—এবং এক মেয়ে, জেনেভিভ। জেনেভিভ পরে ব্যাংকিং খাতে কাজ করেন এবং এক বার্বাডোজ নাগরিককে বিয়ে করেন।
১৯৮৬ সালে সোবার্স ও তাঁর স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটে এবং পরবর্তীতে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর তিনি প্রায় ছয় বছর নিকি স্পার্জিয়নের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন। নিকি ছিলেন তাঁর চেয়ে ২৬ বছরের ছোট এবং সাবেক ব্রিটিশ জুনিয়র স্কোয়াশ খেলোয়াড়।
অবসর জীবন
ক্রিকেট ছাড়ার পর সোবার্স ওয়েস্ট ইন্ডিজ সরকারের ক্রীড়া কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। পরে অস্ট্রেলিয়ায় একটি ক্রীড়াসামগ্রী প্রতিষ্ঠানের প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর দীর্ঘ সময় বার্বাডোজ ট্যুরিজম অথরিটিতে দায়িত্ব পালন করেন।
অবসরজীবনেও ঘোড়দৌড় ও গলফ ছিল তাঁর প্রিয়। তবে বাতজনিত হাঁটুর ব্যথায় গলফ কোর্সে হাঁটাচলা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তিও কমে আসে।

১৯৯৪ সালে, টেস্ট অভিষেকের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে, তাঁর আর্থিক সহায়তার জন্য বার্বাডোজে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়। ১৯৯৮ সালে তাঁকে দেশের দশজন জাতীয় বীরের একজন হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং তাঁর নামের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে “দ্য রাইট এক্সেলেন্ট” উপাধি যুক্ত করা হয়।
আধুনিক ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনা
জীবনের শেষ দিকে সোবার্স প্রায়ই আক্ষেপ করতেন, তাঁর সময়ের ক্রিকেটাররা বর্তমান যুগের তারকাদের তুলনায় খুব সামান্য অর্থ উপার্জন করতে পেরেছেন। তাঁর মতে, আধুনিক যুগের খুব কম ক্রিকেটারই তাঁর মতো প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। ব্যতিক্রম হিসেবে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করতেন ব্রায়ান লারা, শচীন টেন্ডুলকার এবং শেন ওয়ার্নের নাম।
তবে তাঁর জনপ্রিয়তা কখনও কমেনি। গলফ খেলতে গেলে, রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিলে তাঁকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ ছিল সবসময়ই প্রবল। অনেক সময়ই খাবার, পানীয় বা গলফের সুযোগ তাঁকে সৌজন্য হিসেবে দেওয়া হতো।
ক্রিকেট নয়, যদি গলফার হতাম…
নিজের আত্মজীবনীতে সোবার্স লিখেছিলেন—
“জীবন যদি আবার শুরু করার সুযোগ পেতাম, তাহলে ক্রিকেটার নয়, একজন পেশাদার গলফার হতাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটে আপনার পারফরম্যান্স একটু কমলেই গণমাধ্যম আপনাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে। গলফে ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। জ্যাক নিকলাস, গ্রেগ নরম্যান কিংবা আর্নল্ড পামারের মতো কিংবদন্তিদের কেউ কখনও বাতিল করে দেয় না। সবাই বরং তাঁদের দেখতে পেরে আনন্দিত হয়।”
বিদায় এক অমর কিংবদন্তিকে
স্যার গারফিল্ড সোবার্স জন্মগ্রহণ করেন ২৮ জুলাই ১৯৩৬ সালে। তিনি ১৭ জুলাই ২০২৬ সালে ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















