জর্ডানে একটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর সরাসরি ইরানের হামলায় মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। একই সময়ে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবকাঠামোর ওপর আক্রমণে সংঘাত আরও গভীর হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার জর্ডানের ঘাঁটিতে হামলার সময় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার অভিযানে দুই সেনা নিহত হন এবং আরেকজন নিখোঁজ হন। আহত চার সেনাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নিহতদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত ১৬ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই
মার্কিন বাহিনীর হতাহতের খবর প্রকাশের কিছুক্ষণ আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে সম্প্রচারিত এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা অব্যাহত রাখে, তবে শুধু ইরান নয়, ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর সদস্যরাও প্রতিক্রিয়া জানাবে।
এদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানান, প্রায় এক মাস আগে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্র ভঙ্গ করায় তেহরানও আর সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না। নতুন কোনো মধ্যস্থতা উদ্যোগের খবরও পাওয়া যায়নি।
উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, টানা সপ্তম রাতের অভিযানে তারা নজরদারি স্থাপনা, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং সামুদ্রিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, যেসব দেশ মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দিচ্ছে, তাদেরও ‘সমান জবাব’ পাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, গত তিন সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। শুক্রবার একটি সেতুতে হামলায় আটজন নিহত হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
কুয়েতে অবকাঠামোতে বড় ক্ষয়ক্ষতি
শনিবারের ইরানি হামলায় সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কুয়েতে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং একটি তেল স্থাপনায় হামলা হয়েছে।
তেল স্থাপনায় কয়েকজন আহত হন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে আগুন লাগায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের একাধিক ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। মরুপ্রধান কুয়েতে পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশই সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে সরবরাহ করা হয়। দুই দিনের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো এমন স্থাপনায় হামলার ঘটনা।
এ ছাড়া ইরবিলের আকাশে হামলাকারী ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরাক। জর্ডান জানিয়েছে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। বাহরাইন ও সৌদি আরবেও সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়।
ছয় সদস্যের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)-এর মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার জন্য ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলেছেন।
ইরানের ভেতরেও অবকাঠামোতে হামলা
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন বিমান হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশে বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বোনজি পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ধ্বংস হওয়ায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কৌশলগত কেশম দ্বীপের একটি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া রাতভর হামলায় সেতু ও সড়কপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বন্দর আব্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত সীমিত করে দেয় ইরান। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়েছে।
ইরান দাবি করছে, প্রণালিটি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত এবং চলাচলকারী জাহাজকে ফি দিতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং ইরানের তেল রপ্তানি ঠেকাতে দেশটির বন্দরগুলোর ওপর আবারও নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল। তবে চলমান সংঘাতের কারণে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইরানের হামলায় জর্ডানে দুই মার্কিন সেনা নিহতের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
#ইরান #যুক্তরাষ্ট্র #জর্ডান #হরমুজ_প্রণালি #মধ্যপ্রাচ্য #যুদ্ধ #ক্ষেপণাস্ত্র #ড্রোন_হামলা #আন্তর্জাতিক_সংবাদ #সারাক্ষণ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















