রাতের শিফটে কাজ করা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করার প্রভাব শরীর ও মনের ওপর গভীর চাপ তৈরি করছে। নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শুধু ক্লান্তিই নয়, অনিয়মিত ঘুম হৃদরোগ, মানসিক সমস্যা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং নানা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
রাতের কাজ ও শরীরের ঘড়ির দ্বন্দ্ব
মানুষের শরীর সূর্যের আলো ও অন্ধকারের সঙ্গে মিল রেখে একটি স্বাভাবিক ছন্দে চলে। এই অভ্যন্তরীণ ঘড়ি রাতে বিশ্রাম এবং দিনে সক্রিয় থাকার জন্য তৈরি। কিন্তু রাতের শিফটে কাজ করলে শরীরের স্বাভাবিক সংকেতের সঙ্গে কাজের সময়ের সংঘাত তৈরি হয়।
রাতভর কাজ শেষে সকালে ঘরে ফিরেও অনেক কর্মী সহজে ঘুমাতে পারেন না। কারণ শরীর তখন মনে করে দিন শুরু হয়ে গেছে। অন্ধকার ঘর, নীরব পরিবেশ বা ঘুমের নানা প্রস্তুতিও অনেক সময় এই স্বাভাবিক সংকেত পুরোপুরি বদলাতে পারে না।

ঘুমের ঘাটতিতে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ঘুম শুধু বিশ্রামের সময় নয়, এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ পুনর্গঠনের সময়। ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্ক দিনের স্মৃতি সংরক্ষণ করে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে।
দীর্ঘদিন ঘুমের ছন্দ নষ্ট হলে শরীরে চাপের মাত্রা বাড়তে পারে। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি, রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং মানসিক চাপের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় রাতের শিফটে কাজ করা মানুষের মধ্যে স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, রক্তচাপ, ধূমপান ও জীবনযাপনের অন্যান্য বিষয়ও এসব ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দুই ভাগে ঘুমানোর সম্ভাবনা
রাতের শিফটে কর্মীদের জন্য বিজ্ঞানীরা এখন ঘুমের একটি ভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন। একটানা দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পরিবর্তে দিনে দুই ভাগে ঘুমানো অনেকের জন্য কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পদ্ধতিতে রাতের কাজ শেষে কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর পর বিকেলে আবার অল্প সময় বিশ্রাম নেওয়া হয়। অনেক রাতের কর্মীর শরীর স্বাভাবিকভাবেই এমন ছন্দ অনুসরণ করে বলে গবেষকরা লক্ষ্য করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের প্রাচীন জীবনযাত্রায় একটানা ঘুমের বদলে দুই ভাগে ঘুমানোর প্রচলন ছিল। কৃত্রিম আলো ও আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে পরে একটানা ঘুমের অভ্যাস বেশি জনপ্রিয় হয়।
ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা নয়
রাতের শিফটে কাজ করা অনেক মানুষ সকালে কম ঘুম হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। গবেষকরা বলছেন, নিজের শরীরের সংকেত বুঝে ঘুমের পরিকল্পনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
কাজের সুযোগ থাকলে ছোট সময়ের ঘুম বা বিশ্রাম কর্মীদের সতর্কতা বাড়াতে পারে এবং ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও কারখানার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষের জন্য এটি নিরাপত্তার দিক থেকেও জরুরি।
ভবিষ্যতে গবেষণার মাধ্যমে রাতের কর্মীদের জন্য আরও কার্যকর ঘুমের নির্দেশনা তৈরি করার চেষ্টা চলছে। লক্ষ্য হলো শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে কাজের বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















