বৃষ্টি একসময় কবিদের কল্পনায় প্রেম, পুনর্জন্ম আর জীবনের প্রতীক ছিল। এখন একই বর্ষা অনেক শহরে ধ্বংসের আরেক নাম। ঝড়ের পর রাস্তার পাশে উপড়ে পড়ে থাকা বিশাল গাছগুলোকে আমরা প্রায়ই একটি মৌসুমি দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাই। অথচ প্রতিটি পতিত গাছ আমাদের নগর-পরিকল্পনা, পরিবেশবোধ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর এক ব্যর্থতার সাক্ষ্য বহন করে।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনোই একমুখী ছিল না। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, ছায়া দেয়, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, পাখি-পোকামাকড়ের আশ্রয় গড়ে তোলে। বিনিময়ে তাদের প্রয়োজন শুধু একটু মাটি, একটু জায়গা এবং বেঁচে থাকার সুযোগ। কিন্তু আধুনিক শহর যেন সেই সামান্য দাবিটুকুও মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
অনেক নগরেই দেখা যাচ্ছে, বর্ষার প্রথম কয়েক সপ্তাহেই শত শত গাছ উপড়ে পড়ছে। কেউ বলছেন, অতিবৃষ্টি দায়ী; কেউ বলছেন, ঝড়ের তীব্রতা বেড়েছে। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো—কেন এই গাছগুলো এত সহজে ভেঙে পড়ছে? শুধুই কি প্রকৃতির শক্তি, নাকি মানুষের পরিকল্পনার দুর্বলতা তাদের আগেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে?
সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। রাস্তা সংস্কারের নামে বারবার কংক্রিট ঢেলে গাছের চারপাশের মাটি শক্ত করে দেওয়া হয়। নতুন ভবনের জন্য জায়গা তৈরি করতে শিকড়ের বিস্তার সীমিত করা হয়। একের পর এক নির্মাণ প্রকল্পে গাছকে রাখা হয় বাধা হিসেবে, সম্পদ হিসেবে নয়। ফলে বাইরে থেকে সুস্থ ও সবল দেখালেও ভেতরে ভেতরে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। ঝড়ের প্রথম বড় ধাক্কাতেই সেই অদৃশ্য ক্ষতির হিসাব প্রকাশ্যে চলে আসে।

একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের পতন কেবল কাঠের স্তূপ তৈরি করে না। এর সঙ্গে মুহূর্তেই ভেঙে যায় একটি ক্ষুদ্র কিন্তু জটিল বাস্তুতন্ত্র। ডালে থাকা পাখির বাসা, গুঁড়ির ফাঁকে আশ্রয় নেওয়া প্রাণী, ফুলে আসা মৌমাছি, পাতার ওপর নির্ভরশীল প্রজাপতি—অসংখ্য জীব একসঙ্গে তাদের আবাস হারায়। শহরের মানুষ হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে নতুন পথ খুঁজে নেয়, কিন্তু এই নীরব বাসিন্দাদের জন্য বিকল্প ঠিকানা তৈরি হয় না।
আরও একটি ক্ষতি আছে, যার পরিমাপ কোনো সরকারি তালিকায় ধরা পড়ে না। একটি পুরোনো গাছ শুধু পরিবেশের অংশ নয়; বহু পরিবারের স্মৃতি, বহু পাড়ার পরিচয়, বহু প্রজন্মের নীরব সাক্ষী। কারও শৈশবের খেলাঘর, কারও প্রথম স্কুলে যাওয়ার পথ, কারও পারিবারিক ছবির পটভূমি হয়ে বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে থাকে একটি গাছ। সেটি হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় জায়গার সঙ্গে মানুষের আবেগের সংযোগও।
আজকের শহর ক্রমশ এমন এক বাস্তবতায় এগোচ্ছে, যেখানে কংক্রিটের উচ্চতা বাড়ছে, কিন্তু সবুজের গভীরতা কমছে। নতুন ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক অবকাঠামো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়ন যদি সেই পরিবেশকেই দুর্বল করে, যার ওপর শহরের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা নির্ভরশীল, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত নিজের ভিত্তিকেই ক্ষয় করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে ঝড় ও ভারী বৃষ্টির ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটবে—এটি এখন প্রায় নিশ্চিত বাস্তবতা। তাই প্রশ্ন কেবল কতটি গাছ লাগানো হলো, তা নয়; বরং কতটি গাছকে পূর্ণাঙ্গভাবে বাঁচতে দেওয়া হলো। পরিকল্পিত নগরায়ণ মানে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, পুরোনো বৃক্ষকে টিকিয়ে রাখার জন্যও সমান গুরুত্ব দেওয়া।
একটি গাছ উপড়ে পড়ার শব্দ কয়েক মুহূর্তের। কিন্তু তার অনুপস্থিতি বছরের পর বছর শহরের আকাশ, তাপমাত্রা, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়। তাই প্রতিটি পতিত গাছকে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ফল, আমাদের অগ্রাধিকারের প্রতিচ্ছবি।
যে শহর তার গাছকে রক্ষা করতে পারে না, সে শহর শেষ পর্যন্ত নিজেকেও রক্ষা করতে পারে না। কারণ একটি গাছের মৃত্যু কখনোই একা একটি গাছের মৃত্যু নয়; তার সঙ্গে আমাদের জীবন, আমাদের ইতিহাস এবং আমাদের ভবিষ্যতেরও একটি অংশ নীরবে হারিয়ে যায়।
বাচি কারকারিয়া 



















