শিক্ষা শুধু একটি সামাজিক অধিকার নয়, এটি একটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থাও। সেই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের যেমন জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও রয়েছে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার স্বাধীনতা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শেষ পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থাই। চণ্ডীগড় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত—বেসরকারি অনুদানবিহীন স্কুলগুলোকে তাদের আর্থিক বিবরণী ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে—এই মৌলিক প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
স্কুলগুলো প্রতি বছরই সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব, বাজেট এবং অন্যান্য আর্থিক নথি জমা দেয়। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তথ্য গোপন করার সুযোগ তাদের নেই। তারপরও একই তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার নির্দেশ কতটা যৌক্তিক, সেটিই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে স্কুলগুলোর আপত্তি ছিল সহজ। তাদের আশঙ্কা, আর্থিক তথ্য প্রকাশ্যে এলে তা নিয়ে নানা ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু হবে, যা সব সময় সঠিক বা প্রাসঙ্গিক নাও হতে পারে। অভিভাবক বা অন্য যে কেউ আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ তুলতে পারেন, বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারেন, যা শেষ পর্যন্ত শিক্ষা পরিচালনার স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারে। এই উদ্বেগকে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
তবে আদালত ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, অভিভাবকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা বা অনিয়মিত ফি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাই আর্থিক তথ্য উন্মুক্ত থাকলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে। আদালত আরও মন্তব্য করেছে যে, সরকারি কর্মকর্তারা সব সময় পেশাদার হিসাবরক্ষকদের তৈরি আর্থিক বিবরণীর গভীরে গিয়ে প্রকৃত চিত্র অনুধাবন করতে সক্ষম নাও হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে হিসাববিজ্ঞানে দক্ষ অভিভাবক বা নাগরিকদের পর্যবেক্ষণ প্রশাসনের জন্য সহায়ক হতে পারে।
এই যুক্তি প্রথম দর্শনে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়। যদি ধরে নেওয়া হয় সরকারি সংস্থাগুলো পেশাদারভাবে প্রস্তুত করা হিসাব যাচাই করতে অক্ষম, তাহলে সেই ব্যর্থতার সমাধান কি সাধারণ মানুষের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া? নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে জনপর্যবেক্ষণকে বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি আস্থাহীনতারই ইঙ্গিত বহন করে।
সরকার যখন কোনো প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক হিসাব জমা দিতে বলে, তখন ধরে নেওয়াই স্বাভাবিক যে সেই হিসাব বিশ্লেষণ, যাচাই এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও সরকারের রয়েছে। যদি কোনো স্কুল অবৈধভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে বা অন্য কোনো আর্থিক অনিয়মে জড়িত থাকে, তবে তা শনাক্ত ও প্রতিকার করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। এই দায়িত্ব জনসাধারণের ওপর অর্পণ করা কার্যকর প্রশাসনের বিকল্প হতে পারে না।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে—কিছু বেসরকারি স্কুল ইতোমধ্যেই স্বেচ্ছায় তাদের আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করেছে। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবী সিদ্ধান্তকে অন্য সবার জন্য বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। স্বেচ্ছায় স্বচ্ছতা প্রদর্শন এবং আইনগত বাধ্যবাধকতা—দুই বিষয় এক নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বেসরকারি স্কুলের কি কোনো গোপনীয়তার অধিকার আছে? আদালত মত দিয়েছে, শিক্ষা একটি দাতব্য কার্যক্রম হওয়ায় এই ক্ষেত্রে গোপনীয়তার প্রশ্ন তেমন প্রযোজ্য নয়। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। সব বেসরকারি স্কুল দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় পরিচালিত হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠান আইনসঙ্গতভাবেই লাভভিত্তিক মডেলে পরিচালিত হতে পারে। ফলে তাদের আর্থিক তথ্য প্রকাশের প্রশ্নটি কেবল স্বচ্ছতার নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এই বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ আদালতের হাতে যেতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্নটি আজই বিবেচনা করা জরুরি। একটি কল্যাণরাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। বাস্তবে সরকার একা সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেনি বলেই দেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আজ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। এই অবদানকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।
বিস্ময়করভাবে, বেসরকারি স্কুলের ফি নিয়ে প্রায়ই তীব্র আলোচনা হলেও শিক্ষার মান নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম বিতর্ক দেখা যায়। অথচ অভিভাবকেরা সন্তানকে ভর্তি করার আগেই স্কুলের ফি সম্পর্কে অবগত থাকেন। তারপরও যদি তারা সেই প্রতিষ্ঠানই বেছে নেন, তবে পরবর্তীতে শুধু ফি-সংক্রান্ত অসন্তোষকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটিও ভেবে দেখা দরকার।
দেশের প্রয়োজন আরও বেশি মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সরকারি এবং বেসরকারি উভয়ই। একটি ভালো স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে বিপুল বিনিয়োগ, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রয়োজন হয়। যদি নীতিনির্ধারণ এমন বার্তা দেয় যে বেসরকারি উদ্যোগকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখা হবে এবং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হবে, তাহলে নতুন উদ্যোক্তারা এই খাতে আসতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টও অতীতে মত দিয়েছিল যে, জনস্বার্থে আরও মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা জরুরি এবং সে জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যুক্তিসংগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই থাকবে, কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণ এমন হওয়া উচিত নয়, যা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিচালনা বা বিকাশের পথে অযথা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অবশ্যই অপরিহার্য। তবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নামে যদি এমন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা প্রতিষ্ঠানের ন্যায্য স্বাধীনতা ও অধিকারকে সংকুচিত করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষা ব্যবস্থাই। রাষ্ট্রের উচিত অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর থাকা, কিন্তু একই সঙ্গে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সৎ ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থার সঙ্গে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। শিক্ষা নীতিতে এই ভারসাম্যই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
বিচারপতি এস. এস. সোধি 



















