অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে আপাতত সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দেয়নি দিল্লি হাইকোর্ট। তবে আদালত তাঁর বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে তিন দিনের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে এবং পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে ২৪ জুলাই।
রোববার বিচারপতি মিনি পুষ্কর্ণার বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। আদালত জানায়, বিষয়টি কেবল একজন রোগীর স্থানান্তরের প্রশ্ন নয়, বরং বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিচারক বলেন, ওয়াংচুক আটক অবস্থায় নেই এবং তাঁর স্ত্রী, ভাই ও ভগ্নিপতিকে হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের থাকার জন্য আলাদা কক্ষও বরাদ্দ রয়েছে। তাই এই পর্যায়ে অন্তর্বর্তী কোনো নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
অনশন ও হাসপাতালে নেওয়ার প্রেক্ষাপট
গত ২৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন সোনম ওয়াংচুক। তিনি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে এই কর্মসূচি পালন করছিলেন। আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল, নিট (NEET) চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
অনশনের ২১তম দিনে দিল্লি পুলিশ তাঁকে সাফদারজং হাসপাতালে নিয়ে যায়। সরকারের দাবি, দীর্ঘ অনশনের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিল এবং চিকিৎসার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
স্ত্রীর অভিযোগ ও আদালতে আবেদন
ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে. আংমো আদালতে দাখিল করা আবেদনে দাবি করেন, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর তাঁর আস্থা নেই। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিচ্ছে না এবং তাঁদের পছন্দের বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতিও দিচ্ছে না।
আবেদনকারীর পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিব্বল আদালতে বলেন, ওয়াংচুকের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও আইনজীবীদের তাঁর কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁকে কী ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কেও পরিবারকে জানানো হচ্ছে না। তিনি যুক্তি দেন, কোনো নাগরিক যদি আটক না থাকেন, তবে তিনি নিজের পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার অধিকার রাখেন।
সরকারের অবস্থান
কেন্দ্রের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল চেতন শর্মা আদালতে জানান, ১৮ দিনের বেশি অনশন চলায় ওয়াংচুকের শরীরে কিটোসিস ও পটাশিয়ামের ঘাটতির মতো জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই চিকিৎসার স্বার্থেই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সরকারের আইনজীবী আরও বলেন, দিল্লি হাইকোর্টের আগের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল এবং পরিস্থিতির অবনতির কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সাফদারজং হাসপাতালের চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রাখা উচিত। প্রয়োজনে তাঁকে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস)-এও স্থানান্তর করা যেতে পারে।
![]()
হাসপাতালের চিকিৎসকের বক্তব্য
আদালতে উপস্থিত এক সরকারি চিকিৎসক জানান, ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি মুখে খাওয়ার জন্য তরল ও পটাশিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেছেন। তবে শিরায় (আইভি) তরল দেওয়ার প্রস্তাব তিনি নিজেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর সম্মতি ছাড়া কোনো চিকিৎসা জোর করে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।
আবেদনে আরও যেসব অভিযোগ
গীতাঞ্জলি আংমোর আবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাফদারজং হাসপাতালের পরীক্ষায় ও স্বাধীনভাবে করানো পরীক্ষায় ওয়াংচুকের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রায় অসঙ্গতি দেখা গেছে। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতাল রক্তের নমুনা দিতে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা দেরি করেছে এবং স্বাধীন পরীক্ষায় পটাশিয়ামের মাত্রা সরকারি প্রতিবেদনের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে।
এছাড়া আবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতাল থেকে আটকে রাখা অসাংবিধানিক। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও আইনজীবীদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, পছন্দের হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া এবং তাঁর সম্মতি ছাড়া কোনো চিকিৎসা না দেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় গীতাঞ্জলি আংমো বলেন, কোনো পরিবারকে প্রিয়জন কোথায় চিকিৎসা নেবেন, সেই অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হওয়া উচিত নয়। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতালের প্রকাশিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে ওয়াংচুকের পটাশিয়ামের প্রকৃত মাত্রাও উল্লেখ করা হয়নি।
দিল্লি হাইকোর্ট সোনম ওয়াংচুককে আপাতত সরকারি হাসপাতালেই রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখে তিন দিনের মধ্যে তাঁর স্বাস্থ্য পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে ২৪ জুলাই।
দিল্লি হাইকোর্টে সোনম ওয়াংচুকের হাসপাতাল স্থানান্তর নিয়ে শুনানি, স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোর আবেদন আপাতত নাকচ; তিন দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য প্রতিবেদন চেয়েছে আদালত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















