যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তেহরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহনে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার বৈশ্বিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিই তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ।
মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে উত্তেজনা
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দাবি করেছে, তারা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এর আগে তারা ওই অঞ্চলে অবরোধ আরোপের হুমকি দিয়েছিল।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে একটি ‘মাইন পাতা রুট’ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনটি তেলবাহী জাহাজের একটিতে বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। এরপর বাকি দুটি জাহাজও পথ পরিবর্তন করে ফিরে যায়।
![]()
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বেসামরিক নৌযান ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ইরানের হুমকি কমাতে তারা টানা দ্বাদশ রাতের মতো হামলা পরিচালনা করেছে।
তেলের দামে দ্রুত উল্লম্ফন
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বৃহস্পতিবার ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারের ওপরে ওঠে। গত এক সপ্তাহে এর দাম প্রায় ১৩ ডলার বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রেন্টের মূল্যবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়।
নজরে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব
বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকেরা এখন বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কত সংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে। একই সঙ্গে হুথিদের ঘোষিত বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে অবরোধ কার্যকর হয় কি না, সেটিও বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এড়াতে বাব আল-মান্দাব হয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করছিল। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে কিছু জাহাজ এখন সুয়েজ খালমুখী বিকল্প রুট বেছে নিচ্ছে, যা তুলনামূলক ব্যয়বহুল এবং পরিচালনাগতভাবে আরও জটিল।

সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের সতর্কবার্তার পর লোহিত সাগরে অন্তত ছয়টি জাহাজ বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে না গিয়ে দিক পরিবর্তন করেছে।
সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত এমন সময়ে বিস্তৃত হয়েছে যখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার আগে থেকেই চাপে রয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমানে তেলের মজুত কম। একই সঙ্গে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার একাধিক পরিশোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ডিজেলসহ পরিবহন জ্বালানির সরবরাহও সংকুচিত হয়েছে।
জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠান ক্লার্কসন্স সতর্ক করে বলেছে, লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে আরও বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে।
শেয়ারবাজার ও জ্বালানি বাজারের প্রতিক্রিয়া
তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি। ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচক কিছুটা কমলেও এশিয়ার বেশিরভাগ বাজার স্থিতিশীল ছিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির খুচরা মূল্য বাড়তে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার দেশটিতে গ্যাসোলিনের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪.০৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৩৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ডিজেলের গড় দাম বেড়ে হয়েছে প্রতি গ্যালনে ৫.২১ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ বেশি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















