১১:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
জ্বালানির নতুন ভূরাজনীতি: লোহিত সাগরের সংকট কি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও গভীর মন্দার দিকে ঠেলে দেবে? মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আসিয়ানের তাড়াহুড়ো কি নিজেদের অবস্থানকেই দুর্বল করবে? রাহুল গান্ধীকে ঘিরে দিল্লিতে উত্তেজনা: ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে গান্ধী স্মৃতিতে বিরোধী জোটের পদযাত্রা, পথে ব্যারিকেড ও পুলিশের বাধা সিরাজগঞ্জ কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু, অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর শেষ নিঃশ্বাস ভারতের ‘ককরোচ’ আন্দোলন: বিজেপির জন্য নতুন সংকট, নাকি বিরোধীদের শেষ সুযোগ? হার্টের ‘ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক’: চাপের মুহূর্তে জীবনের ছন্দ রক্ষার নতুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শেয়ারবাজারে সপ্তাহ শেষ বড় পতনে, ডিএসইএক্স কমল ৬৬ পয়েন্ট রাহুল গান্ধীর বাড়ির বাইরে র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স মোতায়েন, দিল্লিতে মধ্যরাত পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে উপেক্ষা করার ঝুঁকি: বৈধতার সংকটে রাষ্ট্রের কঠিন পরীক্ষা মামদানি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলে জেলে যেতে হতো তাকেই- মার্ক থিসেন

জ্বালানির নতুন ভূরাজনীতি: লোহিত সাগরের সংকট কি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও গভীর মন্দার দিকে ঠেলে দেবে?

  •  রন বুসো 
  • ১১:৩০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • 1

বিশ্ব জ্বালানি বাজার বহু দশক ধরেই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রপথে হামলা কিংবা সরবরাহ ব্যাহত হওয়া—এসবই বাজারের পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু প্রতিটি সংকটের পরও বাজার কোনো না কোনো বিকল্প পথ খুঁজে নিয়েছে। এবার সেই অভিযোজন ক্ষমতাই কঠিন পরীক্ষার মুখে।

হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থার পর লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীও যদি কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের দুটি প্রধান পথই একসঙ্গে চাপের মুখে পড়বে। এমন পরিস্থিতি শুধু তেলের দাম বাড়াবে না; এটি বৈশ্বিক উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত যখন নতুন মাত্রা পায়, তখন বাজার প্রথম ধাক্কা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বিকল্প রুটের মাধ্যমে। সৌদি আরব দ্রুত পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরকে প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। এভাবে হরমুজ এড়িয়ে এশিয়ায় তেল পাঠানোর একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই পথও এখন নিরাপদ নেই।

ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর বাব আল-মান্দেবে সৌদি জাহাজ চলাচল ঠেকানোর ঘোষণা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গেছে। যে রুট কয়েক মাস আগেও সংকটের সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেটিই এখন নতুন ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু।

এর ফলে শুধু জাহাজের পথ দীর্ঘ হচ্ছে না; গোটা সরবরাহ ব্যবস্থাই ব্যয়বহুল ও ধীর হয়ে পড়ছে। অনেক ট্যাংকারকে এখন সুয়েজ হয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করে আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করতে হচ্ছে। বড় তেলবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে সুয়েজ খালের গভীরতার সীমাবদ্ধতার কারণে অতিরিক্ত খালাস ও পুনরায় লোডিংয়ের মতো জটিল প্রক্রিয়াও যুক্ত হচ্ছে। ফলে একটি যাত্রায় কয়েক সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় লাগছে, সঙ্গে বাড়ছে পরিবহন ও বীমা ব্যয়।

এই দীর্ঘসূত্রতা সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে পরিশোধন শিল্পকে। কারণ অপরিশোধিত তেল শুধু উৎপাদন করলেই হয় না; সেটিকে ডিজেল, পেট্রোল ও অন্যান্য জ্বালানিতে রূপান্তর করাই অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আর সেই অংশটিই এখন সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

চীনে গত কয়েক মাসে পরিশোধন কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দিলেও নতুন সরবরাহ সংকট সেই আশাকে আবারও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের পরিশোধন কার্যক্রমে ধীরগতি মানে বৈশ্বিক শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যের ওপরও চাপ বৃদ্ধি।

একই সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবও জ্বালানি বাজারে বিদ্যমান। রাশিয়ার পরিশোধন অবকাঠামোতে ধারাবাহিক ড্রোন হামলার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে বাধ্য হয়েছে মস্কো। ফলে বাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় অপরিশোধিত তেলের তুলনায় ডিজেল ও পেট্রোলের দাম অনেক দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি এখন শুধু তেল উৎপাদনের নয়; উৎপাদিত তেলকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের সক্ষমতাই বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে চাহিদার ওপর। দাম বাড়লে মানুষ ও শিল্প উভয়ই ব্যবহার কমিয়ে দেয়। অর্থনীতিতে একে বলা হয় “ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন”—অর্থাৎ মূল্য এতটাই বেড়ে যায় যে ভোক্তারা বাধ্য হয়ে ব্যবহার কমিয়ে দেয়। এটি আপাতদৃষ্টিতে চাহিদা কমার ঘটনা হলেও বাস্তবে এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দুর্বলতার লক্ষণ।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চীনে ডিজেল, পেট্রোল এবং পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামালের ব্যবহার কমেছে। ইউরোপেও ডিজেলের ব্যবহার নিম্নমুখী। এসব প্রবণতা দেখায় যে উচ্চ জ্বালানি মূল্য ইতোমধ্যে উৎপাদন ও ভোগ উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এর অভিঘাত শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন ব্যয় বাড়বে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পাবে, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে ঘিরে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এটি শুধু যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ক্ষতির হিসাব নয়; বরং জ্বালানি ব্যয়, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের সম্মিলিত ফলাফল।

অবশ্য বাজার পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়নি। ভারতের মতো কিছু দেশ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়িয়ে সরবরাহের ঘাটতি আংশিক পূরণের চেষ্টা করছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ যখন একের পর এক সমুদ্রপথ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন বিকল্প ব্যবস্থাগুলোর সক্ষমতাও দ্রুত সীমায় পৌঁছে যায়।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো বৈশ্বিক তেলের মজুত। সংঘাতের শুরুর দিকে বিভিন্ন দেশের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুত বাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে সেই মজুত ব্যবহার হওয়ায় এখন সুরক্ষাবলয় অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত। অর্থাৎ নতুন কোনো বড় ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি আগের তুলনায় অনেক কম।

এ কারণেই লোহিত সাগরের সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো সামুদ্রিক নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন একটি সংকেত, যা দেখিয়ে দিচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার বিকল্প পথগুলোও কতটা ভঙ্গুর। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ রুট একসঙ্গে অকার্যকর হয়ে পড়লে বিশ্ববাজারের অভিযোজন ক্ষমতা হয়তো প্রথমবারের মতো তার বাস্তব সীমার মুখোমুখি হবে।

জ্বালানি বাজার এতদিন প্রতিটি সংকটের পর নতুন ভারসাম্য খুঁজে নিতে পেরেছে। কিন্তু যদি প্রধান রুটগুলো ধারাবাহিকভাবে অচল হয়ে যায়, পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি বাড়তে থাকে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হতে শুরু করে, তাহলে বর্তমান সংকট কেবল আরেকটি তেল সংকট থাকবে না। এটি বিশ্ব অর্থনীতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে জ্বালানির অভাব, মূল্যস্ফীতি এবং প্রবৃদ্ধির পতন একসঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জ্বালানির নতুন ভূরাজনীতি: লোহিত সাগরের সংকট কি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও গভীর মন্দার দিকে ঠেলে দেবে?

জ্বালানির নতুন ভূরাজনীতি: লোহিত সাগরের সংকট কি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও গভীর মন্দার দিকে ঠেলে দেবে?

১১:৩০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

বিশ্ব জ্বালানি বাজার বহু দশক ধরেই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রপথে হামলা কিংবা সরবরাহ ব্যাহত হওয়া—এসবই বাজারের পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু প্রতিটি সংকটের পরও বাজার কোনো না কোনো বিকল্প পথ খুঁজে নিয়েছে। এবার সেই অভিযোজন ক্ষমতাই কঠিন পরীক্ষার মুখে।

হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থার পর লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীও যদি কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের দুটি প্রধান পথই একসঙ্গে চাপের মুখে পড়বে। এমন পরিস্থিতি শুধু তেলের দাম বাড়াবে না; এটি বৈশ্বিক উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত যখন নতুন মাত্রা পায়, তখন বাজার প্রথম ধাক্কা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বিকল্প রুটের মাধ্যমে। সৌদি আরব দ্রুত পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরকে প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। এভাবে হরমুজ এড়িয়ে এশিয়ায় তেল পাঠানোর একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই পথও এখন নিরাপদ নেই।

ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর বাব আল-মান্দেবে সৌদি জাহাজ চলাচল ঠেকানোর ঘোষণা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গেছে। যে রুট কয়েক মাস আগেও সংকটের সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেটিই এখন নতুন ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু।

এর ফলে শুধু জাহাজের পথ দীর্ঘ হচ্ছে না; গোটা সরবরাহ ব্যবস্থাই ব্যয়বহুল ও ধীর হয়ে পড়ছে। অনেক ট্যাংকারকে এখন সুয়েজ হয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করে আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করতে হচ্ছে। বড় তেলবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে সুয়েজ খালের গভীরতার সীমাবদ্ধতার কারণে অতিরিক্ত খালাস ও পুনরায় লোডিংয়ের মতো জটিল প্রক্রিয়াও যুক্ত হচ্ছে। ফলে একটি যাত্রায় কয়েক সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় লাগছে, সঙ্গে বাড়ছে পরিবহন ও বীমা ব্যয়।

এই দীর্ঘসূত্রতা সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে পরিশোধন শিল্পকে। কারণ অপরিশোধিত তেল শুধু উৎপাদন করলেই হয় না; সেটিকে ডিজেল, পেট্রোল ও অন্যান্য জ্বালানিতে রূপান্তর করাই অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আর সেই অংশটিই এখন সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

চীনে গত কয়েক মাসে পরিশোধন কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দিলেও নতুন সরবরাহ সংকট সেই আশাকে আবারও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের পরিশোধন কার্যক্রমে ধীরগতি মানে বৈশ্বিক শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যের ওপরও চাপ বৃদ্ধি।

একই সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবও জ্বালানি বাজারে বিদ্যমান। রাশিয়ার পরিশোধন অবকাঠামোতে ধারাবাহিক ড্রোন হামলার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে বাধ্য হয়েছে মস্কো। ফলে বাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় অপরিশোধিত তেলের তুলনায় ডিজেল ও পেট্রোলের দাম অনেক দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি এখন শুধু তেল উৎপাদনের নয়; উৎপাদিত তেলকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের সক্ষমতাই বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে চাহিদার ওপর। দাম বাড়লে মানুষ ও শিল্প উভয়ই ব্যবহার কমিয়ে দেয়। অর্থনীতিতে একে বলা হয় “ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন”—অর্থাৎ মূল্য এতটাই বেড়ে যায় যে ভোক্তারা বাধ্য হয়ে ব্যবহার কমিয়ে দেয়। এটি আপাতদৃষ্টিতে চাহিদা কমার ঘটনা হলেও বাস্তবে এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দুর্বলতার লক্ষণ।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চীনে ডিজেল, পেট্রোল এবং পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামালের ব্যবহার কমেছে। ইউরোপেও ডিজেলের ব্যবহার নিম্নমুখী। এসব প্রবণতা দেখায় যে উচ্চ জ্বালানি মূল্য ইতোমধ্যে উৎপাদন ও ভোগ উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এর অভিঘাত শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন ব্যয় বাড়বে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পাবে, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে ঘিরে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এটি শুধু যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ক্ষতির হিসাব নয়; বরং জ্বালানি ব্যয়, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের সম্মিলিত ফলাফল।

অবশ্য বাজার পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়নি। ভারতের মতো কিছু দেশ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়িয়ে সরবরাহের ঘাটতি আংশিক পূরণের চেষ্টা করছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ যখন একের পর এক সমুদ্রপথ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন বিকল্প ব্যবস্থাগুলোর সক্ষমতাও দ্রুত সীমায় পৌঁছে যায়।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো বৈশ্বিক তেলের মজুত। সংঘাতের শুরুর দিকে বিভিন্ন দেশের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুত বাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে সেই মজুত ব্যবহার হওয়ায় এখন সুরক্ষাবলয় অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত। অর্থাৎ নতুন কোনো বড় ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি আগের তুলনায় অনেক কম।

এ কারণেই লোহিত সাগরের সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো সামুদ্রিক নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন একটি সংকেত, যা দেখিয়ে দিচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার বিকল্প পথগুলোও কতটা ভঙ্গুর। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ রুট একসঙ্গে অকার্যকর হয়ে পড়লে বিশ্ববাজারের অভিযোজন ক্ষমতা হয়তো প্রথমবারের মতো তার বাস্তব সীমার মুখোমুখি হবে।

জ্বালানি বাজার এতদিন প্রতিটি সংকটের পর নতুন ভারসাম্য খুঁজে নিতে পেরেছে। কিন্তু যদি প্রধান রুটগুলো ধারাবাহিকভাবে অচল হয়ে যায়, পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি বাড়তে থাকে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হতে শুরু করে, তাহলে বর্তমান সংকট কেবল আরেকটি তেল সংকট থাকবে না। এটি বিশ্ব অর্থনীতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে জ্বালানির অভাব, মূল্যস্ফীতি এবং প্রবৃদ্ধির পতন একসঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।