একজন শীর্ষ নির্বাহীকে বাইরে থেকে আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ় ও সিদ্ধান্তপ্রবণ মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরে যদি থাকে গভীর অনিরাপত্তা, সেই দুর্বলতা ধীরে ধীরে নেতৃত্ব, কর্মী এবং পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জেপিমরগানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেমি ডিমনের সাম্প্রতিক মন্তব্যে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ডিমনের মতে, বড় দায়িত্ব পাওয়ার পর কেউ কেউ সেই দায়িত্বের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন, আবার কেউ কেউ দায়িত্বের ভারে নিজের অবস্থানকে অস্বাভাবিকভাবে বড় করে তুলতে শুরু করেন। আর এর পেছনে অনেক সময় কাজ করে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি।
ব্যবসা ও নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিরাপদ নেতৃত্ব সবসময় প্রকাশ্য দুর্বলতার মাধ্যমে ধরা পড়ে না। বরং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, সমালোচনা সহ্য করতে না পারা, নিজের কৃতিত্ব জাহির করা কিংবা সব বিষয়ে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টার মধ্য দিয়েও তা প্রকাশ পেতে পারে।
আত্মবিশ্বাস আর আত্মপ্রদর্শন এক নয়
নেতৃত্বে আত্মবিশ্বাস থাকা জরুরি। তবে প্রকৃত আত্মবিশ্বাসী নেতা সব প্রশ্নের উত্তর নিজে জানেন—এমন ভান করেন না। বরং প্রয়োজন হলে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন, অন্যের মতামত শোনেন এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দলের সহায়তা নেন।
অন্যদিকে অনিরাপদ নেতা অনেক সময় নিজের অজ্ঞতা বা অনিশ্চয়তা প্রকাশ করতে ভয় পান। ফলে তিনি এমনভাবে কথা বলেন, যেন সবকিছু তাঁর জানা। কিন্তু বিস্তারিত প্রশ্ন করা হলে তাঁর বক্তব্যের দুর্বলতা প্রকাশ পেতে পারে।
সত্যিকারের আত্মবিশ্বাসের বড় পরিচয় হলো, প্রয়োজনে ‘আমি জানি না’ বলতে পারা। একজন দক্ষ নেতা বুঝতে পারেন, সব উত্তর তাঁর কাছে থাকবে না এবং ভালো সিদ্ধান্তের জন্য দক্ষ সহকর্মীদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সমালোচনা শুনলেই অস্বস্তি
একজন নেতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি হলো সত্য কথা শোনার ক্ষমতা। কিন্তু অনিরাপদ নেতৃত্বে সমালোচনা অনেক সময় পরামর্শ হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে ধরা পড়ে।
ফলে কর্মীরা খারাপ খবর বা ভুলের কথা সরাসরি বলতে ভয় পান। কোনো সমস্যা দেখা দিলে কীভাবে সমাধান করা যায়, তার বদলে কে দায়ী—সেটিই নেতার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এর ফল ভয়াবহ হতে পারে। কর্মীরা তখন প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানের বদলে নেতার রাগ বা প্রতিক্রিয়া সামলাতেই বেশি সময় ব্যয় করেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীর হয়, ভুল বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।
অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও অনিরাপত্তার লক্ষণ
সবকিছু নিজের হাতে রাখাকে অনেক নেতা শক্তিশালী নেতৃত্ব মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় দলের প্রতি আস্থার অভাবকে প্রকাশ করে।
একজন প্রধান নির্বাহী যদি দক্ষ কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়ার পরও প্রতিটি ছোট সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেন, তাহলে কর্মীদের স্বাধীনতা কমে যায়। তারা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ হারান।

বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা যদি নিজের দক্ষতার বাইরের বিষয়েও বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তাহলে দক্ষ কর্মীরা হতাশ হতে পারেন। এমনকি যোগ্য ব্যক্তিরা সেই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগ্রহও হারাতে পারেন।
অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ তাই নেতৃত্বকে শক্তিশালী না করে বরং প্রতিষ্ঠানের গতি কমিয়ে দিতে পারে।
সবাইকে খুশি করার চেষ্টাও বিপদের সংকেত
কর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা অবশ্যই ভালো। কিন্তু সবসময় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকার প্রবল চেষ্টা একজন নেতার ভেতরের অনিরাপত্তার ইঙ্গিত হতে পারে।
কর্মীদের কাছে নিজেকে খুব আধুনিক বা ঘনিষ্ঠ দেখানোর চেষ্টা, প্রতিটি আলোচনায় ঢুকে পড়া কিংবা সবসময় কর্মীদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে উপস্থিত থাকার প্রবণতা কখনো কখনো গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি হয়।
স্বাভাবিক আন্তরিকতা এবং নিজেকে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা—দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি। নেতৃত্বে সবার পছন্দের মানুষ হওয়ার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের কৃতিত্ব দেখানোর প্রবণতা
অনিরাপদ নেতারা নিজেদের যোগ্যতা বারবার প্রমাণ করতে চান। কোনো সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে তাঁরা দলের অবদান ভুলে গিয়ে নিজের ভূমিকা সামনে আনতে থাকেন।
একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য সাধারণত একজনের একক প্রচেষ্টায় আসে না। সেখানে কর্মী, সহকর্মী, ব্যবস্থাপক এবং বিভিন্ন বিভাগের সম্মিলিত অবদান থাকে। অথচ নেতা যদি বারবার শুধু নিজের অর্জন তুলে ধরেন, তাহলে তাঁর আত্মবিশ্বাসের বদলে আত্মস্বীকৃতির প্রয়োজনটাই বেশি চোখে পড়ে।
অন্যের অবদান স্বীকার করতে পারা বরং একজন নেতার প্রকৃত আত্মবিশ্বাসের পরিচয়। কারণ শক্তিশালী নেতা জানেন, অন্যকে কৃতিত্ব দিলে নিজের মর্যাদা কমে না।
অনিরাপদ নেতৃত্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি প্রতিষ্ঠানের
অনিরাপত্তা শুধু একজন প্রধান নির্বাহীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এর প্রভাব পুরো প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কর্মীরা যদি নেতার কাছে সত্য কথা বলতে ভয় পান, সিদ্ধান্ত যদি সবসময় একজনের হাতে আটকে থাকে, যোগ্য মানুষ যদি দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ না পান এবং প্রতিটি সাফল্যের কৃতিত্ব যদি শীর্ষ ব্যক্তি নিজের নামে নিতে চান, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি হয়।
দীর্ঘমেয়াদে এতে কর্মীদের মনোবল কমে যেতে পারে, প্রতিভাবান কর্মীরা প্রতিষ্ঠান ছাড়তে পারেন এবং নতুন প্রতিভা আকৃষ্ট করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ভালো নেতৃত্বের আসল শক্তি কোথায়
জেমি ডিমনের বক্তব্যের মূল শিক্ষা হলো, নেতৃত্বের আসল শক্তি সবসময় কঠোরতা বা সব বিষয়ে নিশ্চিত থাকার মধ্যে নেই। বরং নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝা, ভুল স্বীকার করা, ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে অন্যের সাহায্য চাওয়ার মধ্যেই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়।
একজন নেতা যত বড় পদেই থাকুন না কেন, তিনি যদি নিজের চারপাশে এমন পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে কর্মীরা নির্ভয়ে সত্য কথা বলতে পারেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানও শক্তিশালী হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















