০১:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজারে ফিরেছে প্রাণ, কৃষকের আয়ে নতুন গতি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম কর্মসূচি: সাভারে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন হাফিজ উদ্দিন পদ্মায় ফেরি থেকে ঝাঁপ, প্রায় চার ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার নারী শান্তৌ কেন ব্যর্থ, শেনঝেনের সাফল্যের গল্পে চীনের অর্থনীতির বড় শিক্ষা সারনাথ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়, ভারতের ৪৫তম ঐতিহাসিক স্থাপনা পোষ্যবান্ধব বাসার খোঁজ কমেছে ৫৪ শতাংশ, আইন বদলের পর বদলেছে ভাড়াটিয়াদের আচরণ ক্যালিফোর্নিয়ার সৈকতে সি লায়নকে লাথি, তদন্তে মার্কিন ফেডারেল কর্তৃপক্ষ ভারতের মাটিতে পিরেলির ২০২৭ দিনপঞ্জি, এক ফ্রেমে ভারতীয় নারীর বহুরূপী সৌন্দর্য সানস্ক্রিনে ক্যানসার হয়—ভুয়া দাবিতে বাড়ছে উদ্বেগ বার্লিনে সমকামী অধিকার উৎসবের কাছে গাড়িচাপা, নিহত ১ আহত ১৬

শান্তৌ কেন ব্যর্থ, শেনঝেনের সাফল্যের গল্পে চীনের অর্থনীতির বড় শিক্ষা

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে একসময় পরীক্ষাগার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। শেনঝেন, ঝুহাই ও শিয়ামেন সেই পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু একই সুযোগ পাওয়া শান্তৌ আজ অনেকটাই পিছিয়ে।   , কেন একই নীতির সুবিধা পেয়েও একটি শহর অন্য তিনটির মতো এগোতে পারেনি।

চার শহরের এক পরীক্ষা, ফল ভিন্ন

১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে চীন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বাজারমুখী ব্যবস্থার দিকে এগোতে শুরু করে। তখন উপকূলীয় চার শহর—শেনঝেন, ঝুহাই, শিয়ামেন ও শান্তৌকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

উদ্দেশ্য ছিল এসব এলাকায় তুলনামূলক উদার অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োগ করে তার ফল দেখা। শেনঝেন, ঝুহাই ও শিয়ামেন পরবর্তী সময়ে চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে। কিন্তু শান্তৌ সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।

প্রায় ৫৬ লাখ মানুষের শহর শান্তৌ একসময় চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যবন্দর ছিল। এখানকার সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদেরও যোগ রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে শহরটির অবস্থান এখন বেশ হতাশাজনক।

The Chinese economic experiment that failed

গত বছর শান্তৌতে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫৪ হাজার ইউয়ান। চীনের জাতীয় গড় ছিল প্রায় ১ লাখ ইউয়ান। একই সময়ে শেনঝেনে এই পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার ইউয়ানে। শান্তৌয়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

শুরু থেকেই ছিল কিছু দুর্বলতা

১৯৮০ সালে শান্তৌয়ের মোট দেশজ উৎপাদন শেনঝেনের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি ছিল। অথচ এখন শেনঝেনের অর্থনীতি শান্তৌয়ের প্রায় দশ গুণ।

এর পেছনে শুরু থেকেই কিছু কাঠামোগত সমস্যা ছিল। শান্তৌয়ের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রাথমিক আয়তন ছিল মাত্র ১ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার, যা চার শহরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট।

ভৌগোলিক অবস্থানও ছিল তুলনামূলকভাবে কম সুবিধাজনক। শেনঝেনের পাশে হংকং, ঝুহাইয়ের পাশে ম্যাকাও এবং শিয়ামেনের অবস্থান তাইওয়ান প্রণালির বিপরীতে। শান্তৌ চীনের গুয়াংদং প্রদেশের পূর্ব উপকূলে কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থানে ছিল।

তবে শুধু ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে শান্তৌয়ের পিছিয়ে পড়ার ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ দেশের আরও অনেক অপেক্ষাকৃত দূরের শহরও পরে দ্রুত উন্নতি করেছে। যোগাযোগব্যবস্থারও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।

আবাসন খাতে বড় ধাক্কা

শান্তৌয়ের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে আবাসন খাত থেকে। গত বছর শহরটিতে আবাসন খাতে স্থায়ী সম্পদ বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

Housing sector sinks deeper amid plunging sales, soaring costs | The  Business Standard

এর প্রভাব শহরের ভোগব্যবস্থাতেও পড়েছে। কেন্দ্রীয় এলাকায় পাশাপাশি থাকা তিনটি বড় বিপণিবিতানের মধ্যে দুটি প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে। অনেক রেস্তোরাঁতেও আগের মতো ক্রেতার ভিড় নেই।

অর্থাৎ শুধু উৎপাদন নয়, স্থানীয় মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা ও আগ্রহেও দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। ফলে অর্থনীতির ভেতরের চাহিদাও শক্তিশালী হচ্ছে না।

পুরোনো শিল্পের ফাঁদে শান্তৌ

শেনঝেন যখন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও উচ্চমূল্যের শিল্পের দিকে দ্রুত এগিয়েছে, শান্তৌ অনেকটাই আটকে থেকেছে খেলনা ও পোশাকের মতো শ্রমনির্ভর শিল্পে।

২০২৪ সালে শহরের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় অর্ধেকই ছিল খেলনা ও বস্ত্রনির্ভর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এসব শিল্পে লাভের হার তুলনামূলকভাবে কম এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি।

এর ফলও দেখা গেছে রপ্তানিতে। ২০২৫ সালে শান্তৌয়ের খেলনা রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সামগ্রিক রপ্তানিও কমেছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ।

একটি বন্দরনগরীর জন্য এই পতন বিশেষভাবে উদ্বেগের। কারণ একই সময়ে চীনের সামগ্রিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল রেকর্ড পর্যায়ে।

দুর্নীতি ও আস্থার সংকট

শান্তৌয়ের সমস্যার গভীরে শুধু অর্থনীতি নয়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংস্কৃতির বিষয়ও রয়েছে।

শহরটিতে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবির চাপের কথা বলেছেন। এমনকি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

আবারও কেন বাড়ছে ডলারের দাম

২০০০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পাঠানো দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তারা শান্তৌয়ের একটি বড় হোটেলে আগুনের ঘটনায় মারা যান। ঘটনাটি নিয়ে অগ্নিসংযোগের সন্দেহও তৈরি হয়েছিল।

তবে আরও একটি অস্বাভাবিক সমস্যা রয়েছে—বাইরের মানুষের প্রতি স্থানীয় অনাস্থা। শান্তৌয়ের নিজস্ব উপভাষা এতটাই আলাদা যে চীনের অন্যান্য অঞ্চলের অনেক মানুষের পক্ষেও তা বোঝা কঠিন। ফলে অন্য প্রদেশ থেকে আসা মানুষের স্থানীয় সমাজে মিশে যাওয়া অনেক সময় সহজ হয় না।

এই সামাজিক দূরত্ব ব্যবসা, দক্ষ কর্মী ও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করেছে।

বিদেশি বিনিয়োগেও পিছিয়ে

শান্তৌয়ের অর্থনৈতিক দুর্বলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি।

১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে শহরটি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ পেয়েছে প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার। একই সময়ে শেনঝেন পেয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শান্তৌয়ের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের সম্পর্কও ছিল উল্টো। অর্থনীতি যখন বড় হয়েছে, বাইরের বিনিয়োগ তখন বরং কমেছে।

ফলে নতুন ব্যবসা ও পুঁজি যেমন কম এসেছে, তেমনি মেধাবী তরুণদের একটি অংশ কাজের সন্ধানে শহর ছেড়ে গেছে। তাদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি।

পর্যটনেই এখন আশার আলো

তবে শান্তৌয়ের গল্প পুরোপুরি অন্ধকার নয়। পর্যটন খাতে সাম্প্রতিক সময়ে শহরটি কিছুটা সাফল্য দেখিয়েছে।

২০২৫ সালে সেখানে রাতযাপনকারী পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। পর্যটন থেকে আয়ও বেড়েছে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

The Chinese economic experiment that failed

শহরের পুরোনো অংশকে নতুন করে সাজিয়ে পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। একসময় জরাজীর্ণ ও পুরোনো ভবনে ভরা এলাকাটি এখন রাতের বেলায় মানুষের আনাগোনায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্য সেখানে ধারণ করা হওয়ায় পর্যটকের আগ্রহও বেড়েছে। পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দেওয়ার এই উদ্যোগ শান্তৌয়ের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।

শান্তৌয়ের ব্যর্থতা চীনের জন্য কী শিক্ষা?

শান্তৌয়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, শুধু সরকারি নীতি বা বিশেষ সুবিধা দিয়ে কোনো অঞ্চলকে সফল অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করা যায় না।

শেনঝেন, ঝুহাই ও শিয়ামেন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুবিধা পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তাদের স্থানীয় ব্যবসায়িক পরিবেশ, দক্ষ জনশক্তি, বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা, যোগাযোগ ও প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

শান্তৌয়ের ক্ষেত্রে নীতিগত সুবিধা থাকলেও স্থানীয় দুর্নীতি, বাইরের মানুষের প্রতি অনাস্থা, দুর্বল শিল্প কাঠামো, কম বিদেশি বিনিয়োগ এবং মেধাবীদের চলে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো উন্নয়নের গতি আটকে দিয়েছে।

চীন এখন দেশজুড়ে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। শান্তৌয়ের অভিজ্ঞতা তাই দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—কেন্দ্র থেকে সুযোগ তৈরি করা যায়, কিন্তু স্থানীয়ভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পরিবেশ তৈরি না হলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে না।

একসময় যে শহরকে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের পরীক্ষাগার বানানোর স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, আজ সেই শান্তৌ বরং তার অতীত সংরক্ষণের জন্য বেশি পরিচিত। উন্নয়নের এই বৈপরীত্যই চীনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি বড় শিক্ষা হয়ে উঠেছে।

 

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজারে ফিরেছে প্রাণ, কৃষকের আয়ে নতুন গতি

শান্তৌ কেন ব্যর্থ, শেনঝেনের সাফল্যের গল্পে চীনের অর্থনীতির বড় শিক্ষা

১২:১১:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে একসময় পরীক্ষাগার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। শেনঝেন, ঝুহাই ও শিয়ামেন সেই পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু একই সুযোগ পাওয়া শান্তৌ আজ অনেকটাই পিছিয়ে।   , কেন একই নীতির সুবিধা পেয়েও একটি শহর অন্য তিনটির মতো এগোতে পারেনি।

চার শহরের এক পরীক্ষা, ফল ভিন্ন

১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে চীন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বাজারমুখী ব্যবস্থার দিকে এগোতে শুরু করে। তখন উপকূলীয় চার শহর—শেনঝেন, ঝুহাই, শিয়ামেন ও শান্তৌকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

উদ্দেশ্য ছিল এসব এলাকায় তুলনামূলক উদার অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োগ করে তার ফল দেখা। শেনঝেন, ঝুহাই ও শিয়ামেন পরবর্তী সময়ে চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে। কিন্তু শান্তৌ সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।

প্রায় ৫৬ লাখ মানুষের শহর শান্তৌ একসময় চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যবন্দর ছিল। এখানকার সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদেরও যোগ রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে শহরটির অবস্থান এখন বেশ হতাশাজনক।

The Chinese economic experiment that failed

গত বছর শান্তৌতে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫৪ হাজার ইউয়ান। চীনের জাতীয় গড় ছিল প্রায় ১ লাখ ইউয়ান। একই সময়ে শেনঝেনে এই পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার ইউয়ানে। শান্তৌয়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

শুরু থেকেই ছিল কিছু দুর্বলতা

১৯৮০ সালে শান্তৌয়ের মোট দেশজ উৎপাদন শেনঝেনের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি ছিল। অথচ এখন শেনঝেনের অর্থনীতি শান্তৌয়ের প্রায় দশ গুণ।

এর পেছনে শুরু থেকেই কিছু কাঠামোগত সমস্যা ছিল। শান্তৌয়ের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রাথমিক আয়তন ছিল মাত্র ১ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার, যা চার শহরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট।

ভৌগোলিক অবস্থানও ছিল তুলনামূলকভাবে কম সুবিধাজনক। শেনঝেনের পাশে হংকং, ঝুহাইয়ের পাশে ম্যাকাও এবং শিয়ামেনের অবস্থান তাইওয়ান প্রণালির বিপরীতে। শান্তৌ চীনের গুয়াংদং প্রদেশের পূর্ব উপকূলে কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থানে ছিল।

তবে শুধু ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে শান্তৌয়ের পিছিয়ে পড়ার ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ দেশের আরও অনেক অপেক্ষাকৃত দূরের শহরও পরে দ্রুত উন্নতি করেছে। যোগাযোগব্যবস্থারও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।

আবাসন খাতে বড় ধাক্কা

শান্তৌয়ের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে আবাসন খাত থেকে। গত বছর শহরটিতে আবাসন খাতে স্থায়ী সম্পদ বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

Housing sector sinks deeper amid plunging sales, soaring costs | The  Business Standard

এর প্রভাব শহরের ভোগব্যবস্থাতেও পড়েছে। কেন্দ্রীয় এলাকায় পাশাপাশি থাকা তিনটি বড় বিপণিবিতানের মধ্যে দুটি প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে। অনেক রেস্তোরাঁতেও আগের মতো ক্রেতার ভিড় নেই।

অর্থাৎ শুধু উৎপাদন নয়, স্থানীয় মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা ও আগ্রহেও দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। ফলে অর্থনীতির ভেতরের চাহিদাও শক্তিশালী হচ্ছে না।

পুরোনো শিল্পের ফাঁদে শান্তৌ

শেনঝেন যখন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও উচ্চমূল্যের শিল্পের দিকে দ্রুত এগিয়েছে, শান্তৌ অনেকটাই আটকে থেকেছে খেলনা ও পোশাকের মতো শ্রমনির্ভর শিল্পে।

২০২৪ সালে শহরের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় অর্ধেকই ছিল খেলনা ও বস্ত্রনির্ভর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এসব শিল্পে লাভের হার তুলনামূলকভাবে কম এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি।

এর ফলও দেখা গেছে রপ্তানিতে। ২০২৫ সালে শান্তৌয়ের খেলনা রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সামগ্রিক রপ্তানিও কমেছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ।

একটি বন্দরনগরীর জন্য এই পতন বিশেষভাবে উদ্বেগের। কারণ একই সময়ে চীনের সামগ্রিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল রেকর্ড পর্যায়ে।

দুর্নীতি ও আস্থার সংকট

শান্তৌয়ের সমস্যার গভীরে শুধু অর্থনীতি নয়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংস্কৃতির বিষয়ও রয়েছে।

শহরটিতে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবির চাপের কথা বলেছেন। এমনকি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

আবারও কেন বাড়ছে ডলারের দাম

২০০০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পাঠানো দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তারা শান্তৌয়ের একটি বড় হোটেলে আগুনের ঘটনায় মারা যান। ঘটনাটি নিয়ে অগ্নিসংযোগের সন্দেহও তৈরি হয়েছিল।

তবে আরও একটি অস্বাভাবিক সমস্যা রয়েছে—বাইরের মানুষের প্রতি স্থানীয় অনাস্থা। শান্তৌয়ের নিজস্ব উপভাষা এতটাই আলাদা যে চীনের অন্যান্য অঞ্চলের অনেক মানুষের পক্ষেও তা বোঝা কঠিন। ফলে অন্য প্রদেশ থেকে আসা মানুষের স্থানীয় সমাজে মিশে যাওয়া অনেক সময় সহজ হয় না।

এই সামাজিক দূরত্ব ব্যবসা, দক্ষ কর্মী ও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করেছে।

বিদেশি বিনিয়োগেও পিছিয়ে

শান্তৌয়ের অর্থনৈতিক দুর্বলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি।

১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে শহরটি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ পেয়েছে প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার। একই সময়ে শেনঝেন পেয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শান্তৌয়ের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের সম্পর্কও ছিল উল্টো। অর্থনীতি যখন বড় হয়েছে, বাইরের বিনিয়োগ তখন বরং কমেছে।

ফলে নতুন ব্যবসা ও পুঁজি যেমন কম এসেছে, তেমনি মেধাবী তরুণদের একটি অংশ কাজের সন্ধানে শহর ছেড়ে গেছে। তাদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি।

পর্যটনেই এখন আশার আলো

তবে শান্তৌয়ের গল্প পুরোপুরি অন্ধকার নয়। পর্যটন খাতে সাম্প্রতিক সময়ে শহরটি কিছুটা সাফল্য দেখিয়েছে।

২০২৫ সালে সেখানে রাতযাপনকারী পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। পর্যটন থেকে আয়ও বেড়েছে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

The Chinese economic experiment that failed

শহরের পুরোনো অংশকে নতুন করে সাজিয়ে পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। একসময় জরাজীর্ণ ও পুরোনো ভবনে ভরা এলাকাটি এখন রাতের বেলায় মানুষের আনাগোনায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্য সেখানে ধারণ করা হওয়ায় পর্যটকের আগ্রহও বেড়েছে। পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দেওয়ার এই উদ্যোগ শান্তৌয়ের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।

শান্তৌয়ের ব্যর্থতা চীনের জন্য কী শিক্ষা?

শান্তৌয়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, শুধু সরকারি নীতি বা বিশেষ সুবিধা দিয়ে কোনো অঞ্চলকে সফল অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করা যায় না।

শেনঝেন, ঝুহাই ও শিয়ামেন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুবিধা পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তাদের স্থানীয় ব্যবসায়িক পরিবেশ, দক্ষ জনশক্তি, বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা, যোগাযোগ ও প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

শান্তৌয়ের ক্ষেত্রে নীতিগত সুবিধা থাকলেও স্থানীয় দুর্নীতি, বাইরের মানুষের প্রতি অনাস্থা, দুর্বল শিল্প কাঠামো, কম বিদেশি বিনিয়োগ এবং মেধাবীদের চলে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো উন্নয়নের গতি আটকে দিয়েছে।

চীন এখন দেশজুড়ে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। শান্তৌয়ের অভিজ্ঞতা তাই দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—কেন্দ্র থেকে সুযোগ তৈরি করা যায়, কিন্তু স্থানীয়ভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পরিবেশ তৈরি না হলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে না।

একসময় যে শহরকে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের পরীক্ষাগার বানানোর স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, আজ সেই শান্তৌ বরং তার অতীত সংরক্ষণের জন্য বেশি পরিচিত। উন্নয়নের এই বৈপরীত্যই চীনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি বড় শিক্ষা হয়ে উঠেছে।