ভারতের বক্সিং অঙ্গনে নতুন ইতিহাস গড়ার পর এবার কমনওয়েলথ গেমসে সোনার পদকের লক্ষ্যে রিংয়ে নামছেন জ্যাসমিন লাম্বোরিয়া। ২৪ বছর বয়সী এই বক্সার ইতোমধ্যে ৫৭ কেজি ওজন শ্রেণিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। এবার তাঁর লক্ষ্য বার্মিংহামে জেতা ব্রোঞ্জ পদকের রং বদলে স্বর্ণে পরিণত করা।
জ্যাসমিনের পথটা অবশ্য খুব সহজ ছিল না। প্যারিস অলিম্পিকে প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাঁকে। সেই হতাশাকেই নিজের পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন তিনি। শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক শক্তি বাড়াতেও নতুন করে কাজ করেছেন এই ভারতীয় বক্সার।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন থেকে এবার কমনওয়েলথে সোনার লক্ষ্য
২০২৫ সালটি জ্যাসমিনের ক্যারিয়ারে ছিল বড় সাফল্যের বছর। কাজাখস্তানের আস্তানা ও ভারতের দিল্লিতে বিশ্বকাপের আসরে সোনা জয়ের পর লিভারপুলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপেও সেরা হন তিনি।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে তিনি হারিয়েছেন প্যারিস অলিম্পিকে রুপাজয়ী পোল্যান্ডের জুলিয়া আতেনা শেরেমেতাকে। এর আগে প্যারিস অলিম্পিকের প্রস্তুতির সময় তিনি ৬০ কেজি থেকে আবার ৫৭ কেজি ওজন শ্রেণিতে ফিরে আসেন। এই পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত তাঁর ক্যারিয়ারে বড় সাফল্য এনে দেয়।
এবার তাই আত্মবিশ্বাসী জ্যাসমিনের লক্ষ্য একটাই—কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ নয়, সোনা।

ভারতীয় সেনাবাহিনীতে প্রথম নারী বক্সার
জ্যাসমিনের ক্যারিয়ারের আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায় হলো ভারতীয় সেনাবাহিনীতে তাঁর যোগ দেওয়া। ২০২২ সালের কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ জয়ের পর তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দেশটির প্রথম নারী বক্সার হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন।
বর্তমানে তিনি সেনাবাহিনীর অলিম্পিক প্রস্তুতি কার্যক্রমের অধীনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। পুনের সেনা ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক প্রস্তুতির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
জ্যাসমিন মনে করেন, সেনাবাহিনীতে তাঁর অন্তর্ভুক্তি শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়, অন্য নারী ক্রীড়াবিদদের জন্যও একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।
তাঁর পথ অনুসরণ করছে নতুন প্রজন্ম
নারীদের খেলাধুলায় আরও এগিয়ে নিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী কিশোরীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি বিশেষ উদ্যোগও নিয়েছে। সেখানে ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী মেয়েদের বিভিন্ন অলিম্পিক খেলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
জ্যাসমিনের চোখে বিষয়টি বিশেষভাবে আনন্দের। কারণ তিনি মনে করেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রথম নারী বক্সার হিসেবে তাঁর যাত্রা এখানেই শেষ নয়। তাঁর পর আরও অনেক নারী বক্সার এই পথে এগিয়ে আসবেন।
বক্সিংয়ের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক

হরিয়ানার ভিওয়ানি শহরে বেড়ে উঠেছেন জ্যাসমিন। ভারতের বক্সিংয়ের অন্যতম পরিচিত এই শহরকে অনেক সময় দেশের ‘মিনি কিউবা’ বলা হয়।
বক্সিং তাঁর পরিবারের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর প্রপিতামহ হাওয়া সিং ছিলেন ভারতীয় বক্সিংয়ের অন্যতম পুরোনো তারকা। তিনি ১৯৬৬ ও ১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমসে টানা দুটি স্বর্ণপদক জিতেছিলেন।
তবে জ্যাসমিনের কাছে তাঁর প্রপিতামহের সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু পদকজয়ী বক্সার হিসেবে নয়। শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি তাঁর বিনয়ী স্বভাবও জ্যাসমিনকে অনুপ্রাণিত করেছে।
পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের কাছ থেকেই ছোটবেলায় বক্সিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। প্রায় ১৪ বছর বয়সে তিনি নিয়মিতভাবে বক্সিং প্রশিক্ষণ শুরু করেন।
সাধারণ পরিবার থেকে বিশ্বমঞ্চে
জ্যাসমিনের পরিবার ছিল সাধারণ আর্থিক অবস্থার। তাঁর বাবা হোমগার্ড হিসেবে কাজ করেন এবং মা গৃহিণী। পরিবারের মেয়েদের মধ্যে তিনিই প্রথম খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে বেছে নেন।
পরিবারের সমর্থনই তাঁর সাফল্যের অন্যতম বড় শক্তি বলে মনে করেন জ্যাসমিন। ছোট শহর ও সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে আজ তিনি বিশ্ব বক্সিংয়ের অন্যতম পরিচিত মুখ।

নারী বক্সিংয়ের নতুন অনুপ্রেরণা
ছোটবেলা থেকেই মেরি কম ও বিজেন্দর সিংয়ের মতো ভারতীয় বক্সারদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন জ্যাসমিন। পরবর্তী সময়ে নীরজ চোপড়া, মাইকেল ফেলপস ও মিলখা সিংয়ের মতো ক্রীড়াবিদও তাঁর অনুপ্রেরণার তালিকায় জায়গা করে নেন।
বর্তমানে নিকহাত জারিন, লভলিনা বর্গোহাইন ও পূজা রানির মতো ভারতীয় নারী বক্সারদের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা পান তিনি।
তবে এখন জ্যাসমিন নিজেই হয়ে উঠছেন নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। পুরুষপ্রধান হিসেবে পরিচিত বক্সিংয়ে একজন নারী এবং একই সঙ্গে সেনা ক্রীড়াবিদ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
ব্রোঞ্জকে সোনায় বদলানোর অপেক্ষা
কমনওয়েলথ গেমসে নারী বক্সিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ২০১৪ সালে। এবারের আসরে বক্সিংয়ের লড়াই শুরু হয়েছে ২৪ জুলাই। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ৩১ জুলাই ও ১ আগস্ট।
চার বছর আগে বার্মিংহামে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন জ্যাসমিন। এবার সেই অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়েই গ্লাসগোতে নেমেছেন তিনি।
জাতীয় সংগীত বাজানোর মুহূর্তকে জ্যাসমিন তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন সময়গুলোর একটি মনে করেন। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে লিভারপুলে সেই অনুভূতি পেয়েছিলেন তিনি। এবার গ্লাসগোতেও একই অনুভূতি ফিরে পেতে চান, তবে এবার হাতে চান স্বর্ণপদক।
ভারতের প্রথম নারী সেনা বক্সার জ্যাসমিন লাম্বোরিয়ার লক্ষ্য এখন একটাই—ব্রোঞ্জের পর কমনওয়েলথের রিং থেকে সোনা নিয়ে ফেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















