মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও দেশটির অর্থনীতি এখনো গতি হারায়নি। তবে এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব পড়ছে আমদানি করা পণ্যের দামে। ব্যবসায়ীরা শুল্কের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সরবরাহব্যবস্থা বদলাচ্ছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি খরচের চাপ গিয়ে পড়ছে ক্রেতাদের ওপর।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় দেড় বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বড় ধাক্কা সামলে চলছে। কিন্তু শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং দেশে উৎপাদন ও কারখানার কর্মসংস্থান বাড়ানোর যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল, তার সাফল্য এখনো সীমিত।
৮০টির বেশি দেশের পণ্যে নতুন শুল্ক
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প প্রশাসন ৮০টির বেশি দেশের পণ্যে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্য অংশীদারদের অধিকাংশই এই তালিকায় রয়েছে।
নতুন শুল্কের ফলে আমদানিতে কার্যকর গড় শুল্কের হার প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ গত কয়েক মাসে ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা যে ধরনের শুল্কের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থাতেও পরিস্থিতি অনেকটা একই থাকতে পারে।
এর আগে আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্কের একটি অংশ আদালতের আইনি বাধার মুখে পড়ে। পরে ট্রাম্প প্রশাসন ভিন্ন আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে নতুন শুল্ক কাঠামো তৈরি করেছে। নতুন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজে ব্যবহারের অভিযোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিকেও যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা দ্রুত বদলাচ্ছেন সরবরাহব্যবস্থা
শুল্কনীতিতে বারবার পরিবর্তন এলেও মার্কিন ব্যবসাগুলো পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। সরবরাহের উৎস পরিবর্তন, পণ্যের দাম পুনর্নির্ধারণ এবং আমদানির পরিকল্পনায় দ্রুত পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক প্রতিষ্ঠান বাড়তি চাপ সামলাচ্ছে।
মহামারি ও পরবর্তী মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা ব্যবসাগুলোকে অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় আরও প্রস্তুত করেছে। ফলে শুল্কের কারণে খরচ বাড়লেও অনেক প্রতিষ্ঠান আগের তুলনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে।
গাড়ি নির্মাতা জেনারেল মোটরস চলতি বছরে শুল্ক বাবদ ২৫০ কোটি থেকে ৩৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা জানিয়েছে। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো মুনাফার পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয় সামলানোর কিছুটা সক্ষমতা তৈরি করেছে।
শুল্কের চাপ সবচেয়ে বেশি পণ্যের দামে
ট্রাম্পের শুল্কনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে পণ্যের দামে। বিশেষ করে গাড়ি, খেলনা, শিল্পপণ্যসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়ছে।
চলতি বছরে নতুন গাড়ির দামে শুল্কের কারণে প্রায় ১ হাজার ৬০০ থেকে ৯ হাজার ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়েছে বলে হিসাব পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুল্কের কারণে খাদ্য ও জ্বালানি বাদে মূল পণ্যের দাম প্রায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে।
পণ্যের দাম বৃদ্ধির এই প্রবণতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও চাপ তৈরি করছে। তবে মার্কিন ভোক্তাদের বড় অংশের ব্যয় পণ্য নয়, বরং বাসস্থান, চিকিৎসা, বিনোদন ও বিমানভ্রমণের মতো সেবাখাতে হওয়ায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে শুল্কের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত রয়েছে।
অর্থনীতি বাড়ছে, কিন্তু কারখানায় কর্মসংস্থান কমছে
শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়েনি। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাস থেকে ২০২৬ সালের একই সময় পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দিয়ে অর্থনীতি ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। শক্তিশালী ভোক্তা ব্যয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় বিনিয়োগ এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দুটি বড় লক্ষ্য—বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং কারখানায় কর্মসংস্থান বাড়ানো—এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯৭ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ১০ শতাংশ কম হলেও ঘাটতি এখনো অনেক বড়।
অন্যদিকে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা উৎপাদন ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান উল্টো কমেছে। ২০২৬ সালের জুনে ২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় প্রায় ৭৫ হাজার কম মানুষ উৎপাদন খাতে কাজ করেছেন।
শুল্কনীতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
নতুন শুল্ক কাঠামো ব্যবসায়ীদের জন্য আগের তুলনায় খুব বেশি নতুন চাপ তৈরি না করলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাড়তি শুল্ক শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এখনো শক্তিশালী থাকলেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান না বাড়া এবং বাণিজ্য ঘাটতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা দেখাচ্ছে, শুল্কনীতি দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত সব লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হবে না।
ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সচল থাকলেও আমদানি পণ্যের দাম ও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















