যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট ও কানাডার অন্টারিওর উইন্ডসরকে যুক্ত করা বহুল প্রতীক্ষিত গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতু অবশেষে যান চলাচলের জন্য খুলছে। প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু শুধু দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করবে না, বরং উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে যানজট কমাতেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে সেতুটি চালুর মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক আগের মতো উষ্ণ নয়। বাণিজ্য, শুল্কনীতি এবং দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে নতুন এই সেতু এখন শুধু অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থারও প্রতীক হয়ে উঠেছে।
২৭ জুলাই থেকে সেতুটিতে যান চলাচল শুরু হওয়ার কথা। এর আগে জুনে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আয়োজন করা হলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়। উদ্বোধন বিলম্বিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ ছিল বলে কানাডার পক্ষ থেকে জানানো হয়।
উদ্বোধন ঘিরে তৈরি হয়েছিল রাজনৈতিক টানাপোড়েন
গর্ডি হাও সেতুর উদ্বোধন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষ নতুন করে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন সামনে নিয়ে আসে। সেতুর টোল আয় ভাগাভাগি এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আগে থেকেই মতবিরোধ চলছিল।

জুনের নির্ধারিত উদ্বোধনের আগে ট্রাম্প সেতুটির উদ্বোধন ঠেকানোর সম্ভাবনা নিয়েও চিন্তা করেছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি সেতু চালুর অনুমতিপত্র প্রত্যাহারের চিন্তাও উঠেছিল। পরে সহযোগীদের পরামর্শে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসা হয়।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি পরে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই উদ্বোধন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পর কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কয়েক দশকের যানজট কমানোর লক্ষ্য
ডেট্রয়েট ও উইন্ডসর অঞ্চল উত্তর আমেরিকার গাড়ি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দুই দেশের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্যবাহী ট্রাক এই পথ দিয়ে চলাচল করে।
এতদিন এ অঞ্চলের প্রধান ভরসা ছিল অ্যাম্বাসেডর সেতু। ১৯২৯ সালে চালু হওয়া পুরোনো সেতুটি দিয়ে গত বছর ১৮ লাখের বেশি ট্রাক পার হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত যানজট, সীমান্ত পারাপারে বিলম্ব এবং বাড়তি ব্যয় নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ছিল।
নতুন গর্ডি হাও সেতুতে বেশি সংখ্যক চলাচলের পথ এবং সরাসরি মহাসড়ক সংযোগ থাকায় এই চাপ অনেকটাই কমতে পারে।
ট্রাক চলাচলে কমবে সময় ও খরচ
নতুন সেতুর সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে পণ্যবাহী ট্রাকের জন্য। বর্তমানে অ্যাম্বাসেডর সেতুতে যেতে উইন্ডসরের ব্যস্ত সড়ক ধরে বেশ কয়েকটি ট্রাফিক সংকেত পার হতে হয়। ফলে সীমান্ত পার হতে অতিরিক্ত সময় লাগে।
গর্ডি হাও সেতু দিয়ে গেলে প্রতিটি ট্রাকের সীমান্ত পারাপারের সময় প্রায় ২০ মিনিট পর্যন্ত কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এতে পরিবহন খাতে বিপুল অর্থ সাশ্রয় হতে পারে।
সেতুটির বাণিজ্যিক ট্রাকের টোল প্রতি অক্ষের জন্য ৮ দশমিক ৭৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে অ্যাম্বাসেডর সেতুতে একই ধরনের টোল প্রতি অক্ষের জন্য ২০ ডলার। ফলে নতুন সেতু ব্যবসায়ীদের কাছে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
পুরোনো সেতুর মালিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন সেতুটি অ্যাম্বাসেডর সেতুর মালিক মোরাউন পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন আন্তর্জাতিক সেতু নির্মাণ ঠেকাতে পরিবারটি অতীতে একাধিক আইনি উদ্যোগ নিয়েছিল।
নতুন সেতু নির্মাণের বিরুদ্ধে মিশিগানে একটি গণভোটের উদ্যোগেও প্রায় ৩ কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছিল। তবে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
অন্যদিকে কানাডা শুরু থেকেই নতুন সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের বড় অংশ বহনের সিদ্ধান্ত নেয়। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৬৪০ কোটি কানাডীয় ডলার, যা প্রায় ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান।
সেতু কি বদলাবে দুই দেশের সম্পর্ক?
গর্ডি হাও সেতু বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু অবকাঠামোর এই অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন কতটা কমাতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
দুই দেশের মধ্যে শুল্ক, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ চলছেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্য। ফলে নতুন সেতুর উদ্বোধন একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সুযোগের দরজা খুলছে, অন্যদিকে তেমনি দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাও সামনে আনছে।
গর্ডি হাও সেতু শুধু একটি নতুন যোগাযোগ অবকাঠামো নয়; এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে ভবিষ্যতের গতি, ব্যয় ও দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















