ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের নারী ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আর সেই আলোচনায় কয়েক দশক আগের এক ঐতিহাসিক নাম আবার সামনে এসেছে—রেনে রিচার্ডস। টেনিস ইতিহাসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রকাশ্যে ট্রান্সজেন্ডার পেশাদার ক্রীড়াবিদ হিসেবে পরিচিত।
১৯৭৭ সালের ইউএস ওপেনে নারী হিসেবে খেলার অধিকার আদায়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে জয় পেয়েছিলেন রিচার্ডস। প্রায় পাঁচ দশক পর তাঁর সেই লড়াই, ক্যারিয়ার ও পরবর্তী সময়ে বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে জীবনী প্রকাশ হতে যাচ্ছে।
আদালতের লড়াই থেকে টেনিস কোর্টে
রিচার্ডস ১৯৭৫ সালে লিঙ্গান্তর অস্ত্রোপচার করেন। এর পর প্রকাশ্যে তাঁর পরিচয় জানাজানি হলে নারী খেলোয়াড়দের জন্য লিঙ্গ যাচাই পরীক্ষার নিয়ম চালু করা হয়। ১৯৭৬ সালের ইউএস ওপেনে অংশ নিতে এমন পরীক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। ফলে তাঁকে প্রতিযোগিতায় খেলতে দেওয়া হয়নি।
এরপর আদালতে যান রিচার্ডস। আদালতের আদেশের পর ১৯৭৭ সালের ইউএস ওপেনে নারী হিসেবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। একক খেলায় প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিলেও দ্বৈত খেলায় সঙ্গী বেটি অ্যান স্টুয়ার্টকে নিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন।
পেশাদার টেনিসে প্রায় পাঁচ বছর খেলেছেন রিচার্ডস। এককে তাঁর সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল ২০ নম্বর। পরে তিনি চিকিৎসা পেশায় ফিরে যান এবং কয়েক বছর আগে অবসর নেন।
শুরুতে বিরোধিতা, পরে গ্রহণযোগ্যতা
রিচার্ডসের টেনিসে প্রবেশ নিয়ে সে সময় কিছু বিরোধিতা দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ব্যাপক সংঘাতে রূপ নেয়নি। কয়েকজন খেলোয়াড় তাঁর অংশগ্রহণের প্রতিবাদ করেছিলেন। তবে অধিকাংশ খেলোয়াড়ই ধীরে ধীরে তাঁকে গ্রহণ করে নেন।
টেনিসের কিংবদন্তি বিলি জিন কিংয়ের নেতৃত্বও রিচার্ডসকে খেলোয়াড়দের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেতে সহায়তা করেছিল বলে তাঁর আসন্ন জীবনীতে উঠে এসেছে।
রিচার্ডস পরবর্তী সময়ে শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, প্রশিক্ষক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। তাঁর কোচিংয়ে নাভ্রাতিলোভা ১৯৮২ ও ১৯৮৩ সালে উইম্বলডন জয় করেন।
বদলে গেছে রিচার্ডসের অবস্থান
রিচার্ডসের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি এখন তাঁর বর্তমান অবস্থান। যে নারী হিসেবে খেলতে পারার অধিকার আদায়ে তিনি নিজেই আইনি লড়াই করেছিলেন, বর্তমানে তিনি অধিকাংশ ট্রান্সজেন্ডার নারী ও মেয়ের নারী ক্রীড়ায় অংশগ্রহণের পক্ষে নেই।
তাঁর অবস্থানের ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা হচ্ছে এমন মেয়েদের, যারা পুরুষ বয়ঃসন্ধির মধ্য দিয়ে যায়নি। অর্থাৎ নিজের অতীত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান মতের মধ্যে রিচার্ডসের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
তাঁর আসন্ন জীবনীগ্রন্থের লেখক জুলি ক্লিগম্যানের ভাষায়, রিচার্ডস নিজের খেলোয়াড়জীবনের অবস্থান থেকে অনেকটাই ভিন্ন জায়গায় পৌঁছেছেন। তবে এই পরিবর্তন তাঁর পুরো জীবন ও অভিজ্ঞতাকে আরও জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

বিশ্ব ক্রীড়ায় আবারও লিঙ্গ যাচাই
রিচার্ডসের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির অদ্ভুত মিলও আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন দেশে ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের নারী বিভাগে অংশগ্রহণ সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নারী ক্রীড়াবিদদের যোগ্যতা নির্ধারণে জিনগত পরীক্ষা ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
টেনিসেও লিঙ্গ যাচাইয়ের নতুন নীতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এ ধরনের পরীক্ষা শুধু ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদ নয়, আন্তঃলিঙ্গ বৈশিষ্ট্যের নারী ও অন্যান্য নারী খেলোয়াড়ের জন্যও জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রান্সজেন্ডার নারী ও মেয়েদের নারী ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ফলে প্রায় ৫০ বছর আগে রিচার্ডস যে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেটিই যেন নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
ভুলে যাওয়া ইতিহাস সামনে আনার চেষ্টা
রিচার্ডস এখন ৯১ বছর বয়সী। পেশাদার টেনিস থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি অনেকটাই আলোচনার বাইরে ছিলেন। কিন্তু বর্তমান বিতর্কে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা আবার সামনে এসেছে।
আসন্ন জীবনীতে তাঁর খেলোয়াড়জীবন, লিঙ্গান্তরের আগে ও পরের জীবন, আদালতের লড়াই এবং বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের মতে, রিচার্ডসের গল্প শুধু একজন টেনিস খেলোয়াড়ের জীবনকাহিনি নয়; এটি ক্রীড়া, পরিচয়, অধিকার ও সময়ের সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ারও গল্প।
রিচার্ডসের জীবন তাই আজকের বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়—ক্রীড়াক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তির সীমা কোথায় নির্ধারণ করা হবে? আর কয়েক দশক আগে যে মানুষটি নিজের অংশগ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়েছিলেন, সময়ের পরিবর্তনে তাঁর নিজের অবস্থান কীভাবে বদলে গেল, সেটিও হয়ে উঠেছে আলোচনার বড় বিষয়।
১৮ আগস্ট প্রকাশের কথা রয়েছে রিচার্ডসের জীবনভিত্তিক নতুন জীবনীগ্রন্থটির।
ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের অধিকার, টেনিসের ইতিহাস এবং বদলে যাওয়া অবস্থান নিয়ে রেনে রিচার্ডসের জীবনকাহিনি নতুন করে বিশ্ব ক্রীড়ায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















