১২:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
ইউক্রেনের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যেই ইউরোপীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক মডেল প্রকৃতি ও পাখির টানে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন বিল অডি খোলা পানিতে সাঁতার কতটা নিরাপদ, বৃষ্টির পর বাড়ে যে ভয় রাশিয়ার বেটিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের বিতর্কে ইতালির কোচের দৌড় থেকে ছিটকে পিরলো আঠা-লেবেল ছাড়াই কাগজের প্যাকেজিং, বদলে যেতে পারে পুনর্ব্যবহারের ভবিষ্যৎ বালিতে বিদেশিদের দৌড় ক্লাবে স্থানীয়দের বাদ দেওয়ার অভিযোগ, দুই ডাচ নাগরিক নিষিদ্ধ আসামে ভয়াবহ বন্যা, ছয় দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ে ৬ লাখের বেশি মানুষ জাপানে প্রথম মসজিদ নির্মাণ ঘিরে তীব্র বিতর্ক, পরিচয় সংকটে ফুজিসাওয়া আয়ারল্যান্ডের উপকূলে বিশাল হাঙরের অবিশ্বাস্য কাছাকাছি দেখা মিলছে বয়স বাড়লেও হাড় শক্ত রাখবে যেসব খাবার, দুধের বাইরেও আছে সহজ উপায়

ক্ষুধার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আমেরিকার জয়: শুধু ভর্তুকি নয়, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাই বদলে দিয়েছে বাস্তবতা

দক্ষিণ আমেরিকার কথা একসময় উচ্চারিত হতো অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও দারিদ্র্যের উদাহরণ হিসেবে। অথচ এখন একই অঞ্চল বিশ্বকে দেখাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২০ সালের পর বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ আমেরিকায় ক্ষুধার হার দ্রুততম হারে কমেছে। বর্তমানে অঞ্চলের মাত্র ৩.৫ শতাংশ মানুষ ন্যূনতম ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করতে পারছে না, যা এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন। এই অগ্রগতি কেবল পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়; এটি দেখায় যে সঠিক অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা একসঙ্গে কাজ করলে ক্ষুধার মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও মোকাবিলা করা সম্ভব।

দুই দশক আগে দক্ষিণ আমেরিকা একবার এমন সাফল্যের স্বাদ পেয়েছিল। তখন পণ্যমূল্যের বৈশ্বিক উল্লম্ফন অর্থনীতিকে চাঙা করেছিল, আর সেই অতিরিক্ত আয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছিল। কিন্তু সেই সাফল্যের ভিত ছিল দুর্বল। ২০১৪ সালের পর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম পড়ে গেলে অর্থনীতি সংকুচিত হয়, সরকারি ব্যয় টেকসই থাকে না এবং খাদ্য নিরাপত্তার অগ্রগতি দ্রুত থেমে যায়। পরে কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে; বেকারত্ব ও আয়হানি লাখো পরিবারকে আবার দারিদ্র্য ও ক্ষুধার দিকে ঠেলে দেয়।

South America is eradicating hunger

এবারের পুনরুদ্ধার আগের তুলনায় ভিন্ন। কারণ এটি কেবল সরকারি ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ আমেরিকার বহু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও দক্ষ। মহামারির সময় তারা দ্রুত সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনে। একই সঙ্গে অনেক সরকার ব্যয়সংযম ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ফলে খাদ্যের দাম ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়েছে, আর মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আর্জেন্টিনা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একসময় যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি মাসিক প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছিল, সেখানে এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে এবং মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় নিচে নেমেছে। বলিভিয়ায়ও খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইকুয়েডরে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসব পরিবর্তন সাধারণ মানুষের বাজার খরচ কমিয়েছে এবং নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য সংগ্রহকে সহজ করেছে।

তবে কেবল মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়া ক্ষুধা দূর করতে পারে না। যাদের আয়ই পর্যাপ্ত নয়, তাদের জন্য সরাসরি সহায়তা অপরিহার্য। এখানেই দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় শক্তি—সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। ব্রাজিলের ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ কর্মসূচি তার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে দরিদ্র পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়িয়েছে।

The financial adviser asked for 3 more months to reduce inflation -  Business Mirror

তবে এই কর্মসূচিগুলো আগের মতো নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার এগুলোকে আরও কার্যকর করেছে। ডিজিটাল পেমেন্ট, সমন্বিত সামাজিক নিবন্ধন এবং তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে অনিয়ম কমেছে, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করা সহজ হয়েছে এবং মৌসুমি আয়হীন পরিবারগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিছু দেশে কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণকে সামাজিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, আবার কোথাও সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের বাস্তবতা বিবেচনা করে পুরোনো শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সামাজিক সুরক্ষা এখন আর কেবল বামপন্থী রাজনীতির কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। ডানপন্থী সরকারগুলিও বুঝতে পেরেছে যে ক্ষুধা মোকাবিলা ছাড়া সামাজিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলো অধিকাংশ দেশেই টিকে আছে। এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাই নীতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছে।

তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে কৃষিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নতুন ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং ফসলহানি খাদ্য উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর সঙ্গে যদি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি যুক্ত হয়, তাহলে আগামী সময়ে খাদ্য সরবরাহে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান সাফল্য ধরে রাখতে হলে কৃষি, জলবায়ু অভিযোজন ও খাদ্য ব্যবস্থাপনায় আরও বিনিয়োগ অপরিহার্য।

আরেকটি সমস্যা সামাজিক সহায়তার কাঠামোতেই লুকিয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে একই পরিবার সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকলে কর্মসংস্থানে প্রবেশের প্রণোদনা দুর্বল হতে পারে। কোনো কোনো দেশে দেখা যাচ্ছে, শৈশবে যে পরিবার সামাজিক সহায়তা পেয়েছিল, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও একই কর্মসূচির আওতায় রয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে সহায়তা এমনভাবে নকশা করা যায় যাতে মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসে স্থায়ীভাবে স্বনির্ভর হতে পারে।

How innovative agricultural practices can help to tackle climate change –  CEPS Young Thinkers

একই সময়ে আরেকটি বৈপরীত্যও স্পষ্ট হচ্ছে। ক্ষুধা কমলেও স্থূলতা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বাড়ছে। দক্ষিণ আমেরিকা কৃষিপণ্যে সমৃদ্ধ হলেও স্বাস্থ্যকর খাদ্য—বিশেষ করে ফল ও সবজি—অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল। কারণ বিপুল কৃষিজমি রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, আর দুর্বল অবকাঠামো ও অপর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা তাজা খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ তুলনামূলক সস্তা কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

তবু সামগ্রিক চিত্র আশাব্যঞ্জক। কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, জলবায়ু-সহনশীল উৎপাদনব্যবস্থা, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক কর্মসূচির সংস্কার এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যকে উৎসাহিত করার নীতিমালা—এসব উদ্যোগ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। এর অর্থ, দক্ষিণ আমেরিকার অর্জন কোনো সাময়িক সৌভাগ্যের ফল নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বিত ফল।

বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত। ক্ষুধা দূর করার জন্য শুধু ভর্তুকি বা কেবল বাজার—কোনোটিই একা যথেষ্ট নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম অর্থনীতি, দায়িত্বশীল আর্থিক নীতি এবং দক্ষ সামাজিক সুরক্ষা—এই তিনটির সমন্বয়ই টেকসই সাফল্যের ভিত্তি। দক্ষিণ আমেরিকা এখন প্রমাণ করছে, সঠিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ক্ষুধা ইতিহাসের একটি অধ্যায়ে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউক্রেনের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যেই ইউরোপীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক মডেল

ক্ষুধার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আমেরিকার জয়: শুধু ভর্তুকি নয়, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাই বদলে দিয়েছে বাস্তবতা

১১:১৭:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

দক্ষিণ আমেরিকার কথা একসময় উচ্চারিত হতো অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও দারিদ্র্যের উদাহরণ হিসেবে। অথচ এখন একই অঞ্চল বিশ্বকে দেখাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২০ সালের পর বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ আমেরিকায় ক্ষুধার হার দ্রুততম হারে কমেছে। বর্তমানে অঞ্চলের মাত্র ৩.৫ শতাংশ মানুষ ন্যূনতম ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করতে পারছে না, যা এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন। এই অগ্রগতি কেবল পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়; এটি দেখায় যে সঠিক অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা একসঙ্গে কাজ করলে ক্ষুধার মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও মোকাবিলা করা সম্ভব।

দুই দশক আগে দক্ষিণ আমেরিকা একবার এমন সাফল্যের স্বাদ পেয়েছিল। তখন পণ্যমূল্যের বৈশ্বিক উল্লম্ফন অর্থনীতিকে চাঙা করেছিল, আর সেই অতিরিক্ত আয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছিল। কিন্তু সেই সাফল্যের ভিত ছিল দুর্বল। ২০১৪ সালের পর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম পড়ে গেলে অর্থনীতি সংকুচিত হয়, সরকারি ব্যয় টেকসই থাকে না এবং খাদ্য নিরাপত্তার অগ্রগতি দ্রুত থেমে যায়। পরে কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে; বেকারত্ব ও আয়হানি লাখো পরিবারকে আবার দারিদ্র্য ও ক্ষুধার দিকে ঠেলে দেয়।

South America is eradicating hunger

এবারের পুনরুদ্ধার আগের তুলনায় ভিন্ন। কারণ এটি কেবল সরকারি ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ আমেরিকার বহু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও দক্ষ। মহামারির সময় তারা দ্রুত সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনে। একই সঙ্গে অনেক সরকার ব্যয়সংযম ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ফলে খাদ্যের দাম ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়েছে, আর মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আর্জেন্টিনা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একসময় যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি মাসিক প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছিল, সেখানে এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে এবং মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় নিচে নেমেছে। বলিভিয়ায়ও খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইকুয়েডরে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসব পরিবর্তন সাধারণ মানুষের বাজার খরচ কমিয়েছে এবং নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য সংগ্রহকে সহজ করেছে।

তবে কেবল মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়া ক্ষুধা দূর করতে পারে না। যাদের আয়ই পর্যাপ্ত নয়, তাদের জন্য সরাসরি সহায়তা অপরিহার্য। এখানেই দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় শক্তি—সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। ব্রাজিলের ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ কর্মসূচি তার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে দরিদ্র পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়িয়েছে।

The financial adviser asked for 3 more months to reduce inflation -  Business Mirror

তবে এই কর্মসূচিগুলো আগের মতো নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার এগুলোকে আরও কার্যকর করেছে। ডিজিটাল পেমেন্ট, সমন্বিত সামাজিক নিবন্ধন এবং তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে অনিয়ম কমেছে, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করা সহজ হয়েছে এবং মৌসুমি আয়হীন পরিবারগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিছু দেশে কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণকে সামাজিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, আবার কোথাও সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের বাস্তবতা বিবেচনা করে পুরোনো শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সামাজিক সুরক্ষা এখন আর কেবল বামপন্থী রাজনীতির কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। ডানপন্থী সরকারগুলিও বুঝতে পেরেছে যে ক্ষুধা মোকাবিলা ছাড়া সামাজিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলো অধিকাংশ দেশেই টিকে আছে। এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাই নীতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছে।

তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে কৃষিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নতুন ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং ফসলহানি খাদ্য উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর সঙ্গে যদি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি যুক্ত হয়, তাহলে আগামী সময়ে খাদ্য সরবরাহে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান সাফল্য ধরে রাখতে হলে কৃষি, জলবায়ু অভিযোজন ও খাদ্য ব্যবস্থাপনায় আরও বিনিয়োগ অপরিহার্য।

আরেকটি সমস্যা সামাজিক সহায়তার কাঠামোতেই লুকিয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে একই পরিবার সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকলে কর্মসংস্থানে প্রবেশের প্রণোদনা দুর্বল হতে পারে। কোনো কোনো দেশে দেখা যাচ্ছে, শৈশবে যে পরিবার সামাজিক সহায়তা পেয়েছিল, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও একই কর্মসূচির আওতায় রয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে সহায়তা এমনভাবে নকশা করা যায় যাতে মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসে স্থায়ীভাবে স্বনির্ভর হতে পারে।

How innovative agricultural practices can help to tackle climate change –  CEPS Young Thinkers

একই সময়ে আরেকটি বৈপরীত্যও স্পষ্ট হচ্ছে। ক্ষুধা কমলেও স্থূলতা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বাড়ছে। দক্ষিণ আমেরিকা কৃষিপণ্যে সমৃদ্ধ হলেও স্বাস্থ্যকর খাদ্য—বিশেষ করে ফল ও সবজি—অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল। কারণ বিপুল কৃষিজমি রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, আর দুর্বল অবকাঠামো ও অপর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা তাজা খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ তুলনামূলক সস্তা কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

তবু সামগ্রিক চিত্র আশাব্যঞ্জক। কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, জলবায়ু-সহনশীল উৎপাদনব্যবস্থা, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক কর্মসূচির সংস্কার এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যকে উৎসাহিত করার নীতিমালা—এসব উদ্যোগ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। এর অর্থ, দক্ষিণ আমেরিকার অর্জন কোনো সাময়িক সৌভাগ্যের ফল নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বিত ফল।

বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত। ক্ষুধা দূর করার জন্য শুধু ভর্তুকি বা কেবল বাজার—কোনোটিই একা যথেষ্ট নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম অর্থনীতি, দায়িত্বশীল আর্থিক নীতি এবং দক্ষ সামাজিক সুরক্ষা—এই তিনটির সমন্বয়ই টেকসই সাফল্যের ভিত্তি। দক্ষিণ আমেরিকা এখন প্রমাণ করছে, সঠিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ক্ষুধা ইতিহাসের একটি অধ্যায়ে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়।