চলতি অর্থবছরের আগে শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি প্রকাশ পেয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন ব্যয়ের বিপুল অংশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ অব্যবহৃত থেকে গেছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং জনসেবা প্রদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে এডিপি বাস্তবায়নে কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেলেও পরবর্তী সময় থেকে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের হার কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ব্যয়ের এই স্থবিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি কমিয়ে দিয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয়ে বড় ঘাটতি
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার জন্য ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তবে বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে অর্থবছরের আট মাস পর, ফেব্রুয়ারিতে তা কমিয়ে ২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

এরপরও জুলাই থেকে মে—এই ১১ মাসে সংশোধিত বরাদ্দের মাত্র ৪৮ শতাংশ ব্যয় করতে সক্ষম হয় সরকারি সংস্থাগুলো। ফলে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট বরাদ্দের ৫২ শতাংশ ব্যয় না করেই পড়ে থাকে।
যদিও জুন মাসের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি, তবে ব্যয়ের প্রবণতা অনুযায়ী মাসিক গড় ব্যয় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বাস্তবায়নের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর তা কমে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমে আসে। সর্বশেষ অর্থবছরেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
প্রবৃদ্ধিতে চাপ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টানা দুই প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা তৃতীয় প্রান্তিকে আরও কমে ২ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে।
সাম্প্রতিক তিন অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ওঠানামার মধ্যে রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়ায় এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়।
একই সময়ে শিল্প খাতে ঋণাত্মক ০ দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রম। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমে আসে।

ধীরগতির পেছনে যেসব কারণ
পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি, কৃচ্ছ্রসাধন নীতি, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার অদক্ষতা, প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প শুরুর বিলম্ব এবং সরকারি ক্রয় আইনে সংশোধনের মতো বিষয়গুলো এডিপি বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনের পর প্রশাসনিক পরিবর্তন, অনেক প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে পরিবর্তন, বিভিন্ন প্রকল্প স্থগিত বা পুনর্বিন্যাস এবং নতুন অগ্রাধিকার নির্ধারণের কারণেও বাস্তবায়ন ধীর হয়েছে। দক্ষ জনবলের সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, উন্নয়ন তহবিলের এত বড় অংশ অব্যবহৃত থাকলে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক। তাঁর ভাষ্য, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনসেবা গড়ে ওঠে না, ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য সরকারের নিজস্ব কার্যকর মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















