দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ১৮ মাস পার হলেও মার্কিন অর্থনীতিতে তার প্রতিশ্রুত বড় পরিবর্তনের পুরো চিত্র এখনো দেখা যাচ্ছে না। শুল্ক বৃদ্ধি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মতো একের পর এক ধাক্কা সামলেও অর্থনীতি টিকে আছে। তবে চাকরি, মূল্যস্ফীতি, আয় ও আবাসন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের স্বস্তি এখনো সীমিত।
চাকরির বাজারে কমছে কর্মী ও শ্রমশক্তি
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতি এবং অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের প্রভাব শ্রমবাজারে পড়েছে। মার্কিন জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গেও এই পরিবর্তন যুক্ত হয়েছে। ফলে কাজ করার মতো মানুষের সংখ্যা কমছে এবং একই সঙ্গে কর্মরত মানুষের সংখ্যাতেও দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যানের ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর শ্রমশক্তি ও কর্মরত মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়। নতুন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ফলে জানুয়ারিতে কর্মসংস্থান ও চাকরি খোঁজা মানুষের সংখ্যায় বড় পরিবর্তন দেখা গেলেও, পরবর্তী সময়ে সামগ্রিক প্রবণতাতেও চাপের ইঙ্গিত রয়েছে।
শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ হলো
ট্রাম্পের অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প উৎপাদন ফিরিয়ে আনা এবং কারখানায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিল্প খাতে সেই প্রত্যাশিত জোয়ার দেখা যায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে বড় ধরনের বিনিয়োগের কারণে নির্মাণ খাতে কর্মসংস্থান কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়ের তুলনায় শিল্প উৎপাদন খাতে কর্মীর সংখ্যা এখনো কম।
সরকারি কর্মীর সংখ্যাও কমেছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল অর্থনীতিতে মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার কারণে রেস্তোরাঁ, পানশালা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতেও বিপুল কর্মীর প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থানের কাঠামো এককভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দিয়ে বদলে দেওয়া সহজ নয়।
মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো কাটেনি
২০২৪ সালের নির্বাচনে দ্রব্যমূল্য ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। ট্রাম্প কম দাম নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সার্বিকভাবে পণ্যের দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।

মূল্যস্ফীতির গতি কিছুটা কমলেও কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আসেনি। মূল্যস্ফীতি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যের ওপরে রয়েছে। বরং কিছু নীতিনির্ধারক মনে করছেন, সামনে আবার মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আমদানি শুল্কের কারণে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি উঠে যাওয়ায় সেই চাপ আরও বাড়ে। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের চাহিদাও কিছু পণ্যের দাম বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।
আয় বাড়লেও মানুষের হাতে স্বস্তি কম
মার্কিন ভোক্তারা নানা অর্থনৈতিক ধাক্কার মধ্যেও খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা হয়েছে। কিন্তু এই প্রবণতা কতদিন থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কর ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দেওয়ার পর পরিবারের হাতে থাকা প্রকৃত আয় সম্প্রতি স্থবির হয়ে পড়েছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কমেছেও। এই অর্থই মূলত মানুষের হাতে থাকা অর্থ, যা দিয়ে বাসাভাড়া বা ঋণের কিস্তি, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো হয়।
ফলে অর্থনীতি বাইরে থেকে স্থিতিশীল দেখালেও সাধারণ পরিবারের ওপর ব্যয়ের চাপ কমেনি।
বাড়ি কেনা এখনো কঠিন
যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন ব্যয়ও বড় সমস্যা হয়ে আছে। বাড়ির দাম, ঋণের সুদ এবং বাড়ির বীমার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারের জন্য নিজস্ব বাড়ি কেনা কঠিন হয়ে উঠেছে।

মহামারির সময় দীর্ঘদিনের কম সুদের কারণে বাড়ির বাজারে ব্যাপক উত্থান হয়েছিল। পরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো হলে গৃহঋণের খরচও বেড়ে যায়।
কেন্দ্রীয় সরকার কর সুবিধা বা অন্যান্য সহায়তা দিয়ে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু বাড়ি নির্মাণ, জমির ব্যবহার ও স্থানীয় অনুমোদনের বড় অংশ স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সমস্যাটির দ্রুত সমাধান সহজ নয়।
শেয়ারবাজারে উত্থান, চালিকাশক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
শেয়ারবাজারের শক্তিশালী অবস্থাকে ট্রাম্প তার অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজার সাধারণত বাড়তে থাকে এবং শুধু প্রেসিডেন্টের নীতির ওপর এর পুরো গতিপথ নির্ভর করে না।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৮ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ার সূচক প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের প্রথম ১৮ মাসের গড় বৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করলে এটি ভালো অবস্থান হলেও একেবারে নজিরবিহীন নয়।
এই উত্থানের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত। তথ্যকেন্দ্রসহ এ খাতে বিপুল বিনিয়োগ শুধু শেয়ারবাজার নয়, সামগ্রিক ব্যবসায়িক বিনিয়োগেও বড় প্রভাব ফেলছে।

করপোরেট ঋণেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে বিনিয়োগের কারণে বড় কোম্পানিগুলোর ঋণ সংগ্রহও বেড়েছে। চলতি বছরের জুনের শেষ পর্যন্ত কোম্পানিগুলো মোট প্রায় ১ দশমিক ৫২ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণপত্র বাজারে ছাড়েছে, যা মহামারির পরের সময়ের দ্রুততম গতির মধ্যে রয়েছে।
এই ঋণের বড় একটি অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যবহার হচ্ছে। ঋণের চাহিদা, শক্তিশালী কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ—সব মিলিয়ে মার্কিন অর্থনীতির ভেতরে এখনো যথেষ্ট স্থিতিস্থাপকতার ইঙ্গিত রয়েছে।
সামনে বড় পরীক্ষা
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৮ মাসে মার্কিন অর্থনীতি বড় ধাক্কাগুলো সামলে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সবগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। কর্মসংস্থান, শিল্প খাত, মূল্যস্ফীতি, আয় এবং আবাসন ব্যয়ে সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি এখনো পুরোপুরি আসেনি।
এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, তেলের দাম, আমদানি শুল্ক এবং মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি অর্থনীতির সামনে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—শেয়ারবাজারের শক্তিশালী অবস্থার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব উন্নতি কতটা নিশ্চিত করা যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















