এশিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত তাপীয় কয়লার আমদানি টানা তৃতীয় মাসে বেড়েছে। গ্রীষ্মের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় ক্রেতারা কয়লা কেনা বাড়ানোয় জুলাইয়ে এশিয়ার মোট আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায়ও বেশি হওয়ার পথে।
জুলাইয়ে এশিয়ার তাপীয় কয়লা আমদানি প্রায় ৭ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার টন হতে পারে। জুনে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৭ কোটি ৩ লাখ ১০ হাজার টন। গত বছরের জুলাইয়ে আমদানি হয়েছিল প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার টন।
চীনের আমদানিতে বড় উল্লম্ফন
এশিয়ার কয়লা আমদানির এই বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে চীন। জুলাইয়ে দেশটির তাপীয় কয়লা আমদানি প্রায় ২ কোটি ৮১ লাখ ৪০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে, যা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুনে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ৫৬ লাখ ৭০ হাজার টন এবং গত বছরের জুলাইয়ে ছিল ২ কোটি ৪১ লাখ টন।
চীনে কয়লা আমদানি বাড়ার পেছনে শুধু জ্বালানির দামের বিষয়টি কাজ করছে না। দেশটির অভ্যন্তরীণ কয়লা উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা বাড়াও বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
জুনে চীনের কয়লা উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রায় ৩৮ কোটি ৮ লাখ ৮০ হাজার টনে নেমে আসে। একটি ভয়াবহ খনি দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা পরিদর্শন জোরদার হওয়ায় উৎপাদনে এই চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে জুনে চীনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে এই বৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও বাড়ছে চাহিদা
জুলাইয়ে জাপানে তাপীয় কয়লার আমদানি প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ ৬০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে। জুনে দেশটির আমদানি ছিল প্রায় ৭৫ লাখ ১০ হাজার টন। জানুয়ারির পর এটিই হতে যাচ্ছে জাপানের সর্বোচ্চ মাসিক আমদানি।
দক্ষিণ কোরিয়াতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জুলাইয়ে দেশটির কয়লা আমদানি প্রায় ৮৫ লাখ ৪০ হাজার টনে দাঁড়াতে পারে, যা জুনের ৬০ লাখ ৮০ হাজার টনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
গ্রীষ্মে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের তুলনায় কয়লার তুলনামূলক কম দামও এশিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোকে কয়লার দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে কয়লার দাম
চাহিদা বাড়ার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। অস্ট্রেলিয়ার উচ্চমানের তাপীয় কয়লার দাম জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে চার সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতি টনের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩২ দশমিক ৭৬ ডলার।
ইন্দোনেশিয়ার তুলনামূলক কম শক্তিমান কয়লার দামও বছরের শুরুর তুলনায় অনেক বেড়েছে। জুনের শেষ দিকে প্রতি টনের দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পরে কিছুটা কমলেও বছরের শুরুর সর্বনিম্ন দামের তুলনায় এখনো তা প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি।
ভারতের চিত্র একেবারেই ভিন্ন
এশিয়ার অন্য বড় ক্রেতাদের বিপরীতে ভারতের কয়লা আমদানি জুলাইয়ে কমার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটি জুলাইয়ে সমুদ্রপথে প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ ৮০ হাজার টন তাপীয় কয়লা আমদানি করতে পারে। জুনে এই পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ টন।
এটি গত বছরের আগস্টের পর ভারতের সর্বনিম্ন মাসিক আমদানি হতে পারে।
বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছালেও আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম বেশি থাকায় ভারত বেশি কয়লা কিনতে পারছে না। এরই মধ্যে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লার মজুতও চাপে পড়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এসব কেন্দ্রে গড়ে প্রায় ১৪ দিনের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কয়লা মজুত ছিল। সাধারণ সময়ে এই মজুত তিন থেকে চার সপ্তাহের জন্য যথেষ্ট থাকে।
সামনে কী হতে পারে
ইন্দোনেশিয়ার কয়লার দাম কিছুটা কমে আসায় আগামী সপ্তাহগুলোতে ভারতের আমদানি বাড়তে পারে। তবে উল্লেখযোগ্য হারে আমদানি বাড়াতে হলে দাম আরও দীর্ঘ সময় ধরে কম থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে চীনের অভ্যন্তরীণ কয়লা উৎপাদন আগামী মাসগুলোতে বাড়তে পারে। তারপরও আমদানি খুব দ্রুত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও বিদ্যুতের মোট চাহিদা পূরণে তা এখনো যথেষ্ট নয়।
২০২৬ সালে এশিয়ার বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়তে থাকলে তাপীয় কয়লার বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাড়তি চাহিদা আন্তর্জাতিক কয়লার দামকে ঊর্ধ্বমুখী রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এশিয়া বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহন করা তাপীয় কয়লার প্রায় ৯০ শতাংশ কিনে থাকে। ফলে এই অঞ্চলের আমদানি বাড়া বা কমার ওপর বিশ্ববাজারের কয়লার দাম ও জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশই নির্ভর করে।
এশিয়ায় কয়লার আমদানি বাড়লেও ভারতের ব্যতিক্রমী অবস্থান তাই শুধু একটি দেশের বাজারের চিত্র নয়; বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাহিদা, দাম ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তিত সমীকরণেরও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এশিয়ায় তাপীয় কয়লার আমদানি জুলাইয়ে টানা তৃতীয় মাসে বাড়ছে। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাড়তি চাহিদা বাজার চাঙা করলেও দামের চাপে ভারতের আমদানি কমছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















