চীনে তৈরি নতুন প্রজন্মের মানবাকৃতি রোবটসহ বিদেশি উন্নত রোবট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এসব রোবট থেকে ‘অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি’ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ঘোষিত এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় মানবাকৃতি রোবটের পাশাপাশি চার পায়ে চলতে সক্ষম উন্নত রোবটও রয়েছে। এসব প্রযুক্তির বড় একটি অংশ চীনে তৈরি হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তির উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলার মধ্যেই ওয়াশিংটনের নতুন এই পদক্ষেপ সামনে এলো।
রোবট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, বিদেশে তৈরি উন্নত রোবট আমেরিকান নাগরিকদের ওপর নজরদারি, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা দূর থেকে রোবট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সংস্থাটির আশঙ্কা, বিদেশি নির্মাতাদের তৈরি রোবটের মাধ্যমে ক্ষতিকর পক্ষ আমেরিকানদের ওপর নজরদারি চালাতে পারে বা সাইবার হামলার মতো কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারে।

তবে নতুন নিষেধাজ্ঞা আগে থেকেই অনুমোদিত রোবটের বিক্রি বা আমদানিতে বাধা দেবে না। নিষেধাজ্ঞাটি মূলত নতুন বিদেশি তৈরি উন্নত রোবটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
বিদ্যুৎ রূপান্তর যন্ত্রেও নিষেধাজ্ঞা
শুধু রোবট নয়, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ রূপান্তরকারী যন্ত্র আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তথ্যকেন্দ্র ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত এসব যন্ত্রকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থার দাবি, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তৈরি এসব যন্ত্র দূর থেকে বন্ধ করে দেওয়া, তথ্য চুরি, অননুমোদিত প্রবেশ বা নজরদারির কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
চীনের কড়া প্রতিক্রিয়া
ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ইস্যুকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এবং ভিত্তিহীন অজুহাতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া চীন দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
চীন জানিয়েছে, নিজেদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন পদক্ষেপের জবাব দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন যেন মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়, সে জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বানও জানিয়েছে দেশটি।
রোবট প্রযুক্তিতে চীনের দ্রুত অগ্রগতি
![]()
মানবাকৃতি রোবট তৈরিতে চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি। দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কারখানা থেকে শুরু করে বাড়িঘরে ব্যবহারের জন্য দ্রুত নতুন নতুন রোবট বাজারে আনছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও মানবাকৃতি রোবট তৈরিতে কাজ করছে। তবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে ব্যবসায়িক ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এসব যন্ত্র বাজারজাত করার ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি সংঘাত আরও তীব্র
নতুন নিষেধাজ্ঞাটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিরোধকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এর আগে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও উন্নত অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ দেখা দিয়েছে।
চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি চীনে উন্নত অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি বিক্রির ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে। চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে ভবিষ্যতে আরও নিষেধাজ্ঞার কথাও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
তবে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের অগ্রগতি নিজেদের পরিশ্রম, উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফল বলে দাবি করে আসছে বেইজিং।
সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপের আশঙ্কা
চীনের ওপর নতুন করে প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। এর আগে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের রপ্তানিতে চীনের নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার পর বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
মানবাকৃতি রোবটের যন্ত্রাংশ, বিদ্যুৎ রূপান্তরকারী সরঞ্জাম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বাজারে চীনের বড় ভূমিকা থাকায় নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি পণ্যের আমদানি বন্ধের বিষয় নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট প্রযুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায় হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















