একটি স্কুল ছুটি হলে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষিকার দিনের কাজ তখনও শেষ হয় না। ক্লাসের খাতা দেখা, পরের দিনের পাঠ প্রস্তুত করা, অভিভাবকদের বার্তার উত্তর দেওয়া, অতিরিক্ত কোচিং নেওয়া কিংবা সংসারের খরচ মেটাতে অন্য কোনো আয়ের পথ খোঁজা—এসবই তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা। অনেকের কাছে এটি ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি, যেখানে শিক্ষা পেশাকে সামাজিকভাবে সম্মান দেওয়া হলেও অর্থনৈতিকভাবে তার যথাযথ মূল্য দেওয়া হয় না।
এই বৈপরীত্য কেবল ইন্দোনেশিয়ার নয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশেই শিক্ষকদের পেশাকে এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়, যেন এটি জীবিকা নয়, আত্মত্যাগের ক্ষেত্র। সমাজ শিক্ষককে শ্রদ্ধা জানায়, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা প্রায়ই বেতনের হিসাবের খাতায় পৌঁছায় না। ফলাফল হলো—উচ্চশিক্ষিত তরুণরা শিক্ষা পেশায় এলেও খুব দ্রুত তারা বুঝতে পারেন, এই পেশা দিয়ে সম্মান পাওয়া যায়, কিন্তু টেকসই জীবনযাপন নিশ্চিত করা যায় না।
শিক্ষা খাত: দক্ষ জনশক্তির সবচেয়ে বড় আশ্রয়
শিক্ষা খাতকে সাধারণত একটি সামাজিক সেবা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এটি একই সঙ্গে একটি বিশাল শ্রমবাজারও। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া অসংখ্য তরুণ-তরুণী তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পান এই খাতেই। শিক্ষকতা, শিক্ষা প্রশাসন কিংবা অন্যান্য পেশাগত শিক্ষাসেবার মতো কাজ তাদের অর্জিত দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে।
কিন্তু এই সাফল্যের গল্পের আরেকটি দিক রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে কাজের মিল থাকলেও আয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা খাত পিছিয়ে পড়ে। অর্থাৎ একজন তরুণ শিক্ষক হয়তো এমন কাজ করছেন, যার জন্য তার বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অপরিহার্য; কিন্তু সেই কাজের পারিশ্রমিক অন্য অনেক কম দক্ষতার ক্ষেত্রের তুলনায়ও কম। ফলে শিক্ষা পেশা যোগ্যতার মর্যাদা দিলেও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়।
শ্রেণিকক্ষের বাইরের অদৃশ্য শ্রম
অনেক সময় শিক্ষকতার কর্মঘণ্টা নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হয়। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, কয়েক ঘণ্টা ক্লাস নেওয়াই যেন একজন শিক্ষকের পুরো কাজ। বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকার সময়ই কেবল কাজের একটি অংশ।
পাঠ পরিকল্পনা তৈরি, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের সহায়তা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, বিভিন্ন সভা, নতুন পাঠক্রমের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ—এসবই শিক্ষকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব কাজের বড় অংশই হয় বাড়িতে, রাতের বেলা কিংবা ছুটির দিনে। ফলে শিক্ষকতার কাজকে কেবল ঘণ্টা দিয়ে মাপা যায় না; এটি এমন একটি পেশা যেখানে ব্যক্তিগত সময় এবং পেশাগত দায়িত্বের সীমারেখা প্রায়ই মিলিয়ে যায়।
কম বেতন কেন দীর্ঘস্থায়ী হয়
প্রশ্ন হলো, যদি শিক্ষা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে শিক্ষকদের আয় এত কম কেন? এর উত্তর কেবল বাজারের নিয়মে সীমাবদ্ধ নয়। বেতন নির্ধারণে সরকারি বাজেট, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা, নিয়োগব্যবস্থা, শ্রমিক সংগঠনের কার্যকারিতা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা—সবকিছুই প্রভাব ফেলে। অনেক শিক্ষক অস্থায়ী বা স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে কাজ করেন। কেউ কেউ বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও স্থায়ী মর্যাদা পান না। আবার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পথ দীর্ঘ, প্রতিযোগিতামূলক এবং অনিশ্চিত।
এই বাস্তবতায় শিক্ষকরা ব্যক্তিগতভাবে দরকষাকষির ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। কারণ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, আর প্রতিষ্ঠানও সহজে তাদের পরিবর্তে নতুন কাউকে নিয়োগ করতে পারে। ফলে কম বেতন একটি ব্যতিক্রম নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় আয় নয়, টিকে থাকার সংগ্রাম
যখন একটি পূর্ণকালীন পেশা ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয়ও বহন করতে পারে না, তখন মানুষ অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য হয়। শিক্ষকরা তাই সন্ধ্যায় কোচিং করান, অনলাইনে ক্লাস নেন, ছোট ব্যবসা করেন কিংবা অন্য কোনো খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত হন।
এটি উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প নয়; বরং একটি ব্যর্থ শ্রমবাজারের লক্ষণ। একজন পেশাজীবী যদি নিজের মূল পেশার বাইরে অতিরিক্ত কাজ ছাড়া সংসার চালাতে না পারেন, তাহলে তার শ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন হচ্ছে না। এতে শুধু ব্যক্তিগত ক্লান্তিই বাড়ে না, পেশাগত মনোযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার মানের ওপর।
যত্নের কাজের অবমূল্যায়ন
বিশ্বজুড়েই একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়—যেসব পেশা যত্ন, ধৈর্য ও মানবিক সেবার সঙ্গে যুক্ত, সেগুলোর আর্থিক মূল্যায়ন তুলনামূলক কম। শিক্ষা পেশাও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়।
বিশেষ করে যখন কোনো পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বেশি থাকে, তখন সামাজিকভাবে সেটিকে ‘স্বাভাবিক সেবা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও নৈতিকতা, আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও সেবার ভাষা এত বেশি ব্যবহৃত হয় যে ন্যায্য বেতনের দাবি কখনও কখনও অস্বস্তিকর বলে মনে করা হয়। যেন একজন শিক্ষক বেশি আয় চাইলে তার পেশাগত আদর্শ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
এই মানসিকতা শুধু শিক্ষকদের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কারণ এটি মেধাবীদের শিক্ষা পেশা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং যারা থাকেন, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
মানবসম্পদ গড়তে হলে শিক্ষককে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে
যে কোনো দেশই উন্নত মানবসম্পদ, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীল অর্থনীতির কথা বলে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তি তৈরি করেন শিক্ষকরা। যদি শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা, পেশাগত অগ্রগতি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে উন্নয়নের বড় বড় পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সমাধান কোনো জটিল তত্ত্বে নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ ও কার্যকর নিয়োগব্যবস্থা, স্থিতিশীল কর্মচুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রারম্ভিক বেতন এবং এমন একটি পদোন্নতি কাঠামো, যেখানে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার উন্নয়ন সরাসরি আয়ে প্রতিফলিত হবে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের বাইরে পাঠ প্রস্তুতি, মূল্যায়ন, পরামর্শদান ও অন্যান্য অদৃশ্য শ্রমকেও কর্মঘণ্টার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
একটি সমাজ তার শিক্ষকদের কীভাবে মূল্যায়ন করে, সেটিই শেষ পর্যন্ত বলে দেয় সে ভবিষ্যৎকে কতটা গুরুত্ব দেয়। আত্মত্যাগের প্রশংসা অবশ্যই মহৎ; কিন্তু একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ভিত্তি হতে পারে না কেবল নিষ্ঠা বা ত্যাগের আহ্বান। যারা আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, তাদের পেশাকে যদি এখনো সস্তা শ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু শিক্ষক নন—ক্ষতিগ্রস্ত হবে সমগ্র সমাজের মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বপ্ন।
এলিটা পার্তিউই ও রাদেন মুহামাদ পুর্নাগুনাওয়ান 


















