যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত নতুন নিষেধাজ্ঞা বিল নিয়ে নতুন মন্তব্য করেছেন। বিলটি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগত ভোটে এগিয়ে যাওয়ার পর তিনি বলেন, এটি হয়তো অপরিহার্য নয়, তবে প্রয়োজন হলে বিলটিতে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, ইরানের ওপর শুল্ক আরোপের ক্ষমতাও যুক্ত করা উচিত।
এই বিল কার্যকর হলে ভারতসহ রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতা কয়েকটি দেশ সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মার্কিন শুল্কের মুখোমুখি হতে পারে। তবে সেই শুল্ক আরোপ বা প্রত্যাহারের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতেই থাকবে।
রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ
প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহামের প্রণীত এই বিলের লক্ষ্য ইউক্রেনে আগ্রাসনের জেরে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো। সিনেটে ৮৬-১২ ভোটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করার পর বিলটি এখন পরবর্তী আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছে।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, বিলটিতে ইরানের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের বিস্তৃত ক্ষমতা যুক্ত করা উচিত। তাঁর ভাষায়, এটি প্রয়োজনীয় নাও হতে পারে, কিন্তু যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে ইরানকে শুধু নিষেধাজ্ঞার আওতায় নয়, শুল্ক ব্যবস্থার আওতায়ও আনা গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রস্তাব বিলটির অগ্রযাত্রা কিছুটা ধীর করতে পারে, কারণ এটি প্রতিনিধি পরিষদে যাওয়ার আগে নতুন করে সংশোধনের প্রশ্ন তুলতে পারে।
কোন দেশগুলো ঝুঁকিতে
বিল অনুযায়ী, ভারত, চীন, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি এবং আজারবাইজানের মতো যেসব দেশ রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। বিলটি আইনে পরিণত হলে প্রেসিডেন্ট চাইলে ভারতের মতো বড় ক্রেতাদের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবেন। একই সঙ্গে সেই শুল্ক প্রত্যাহারের ক্ষমতাও প্রেসিডেন্টের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও মতভেদ
রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অনেক ডেমোক্র্যাট থাকলেও, প্রেসিডেন্টকে এত বিস্তৃত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া নিয়ে দলের ভেতরেই আপত্তি রয়েছে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এ ধরনের ক্ষমতা আমদানিপণ্যের ব্যয় বাড়াতে পারে। ফলে বিলটি সিনেটের পরবর্তী ধাপ এবং পরে প্রতিনিধি পরিষদে অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে পারে। প্রতিনিধি পরিষদ সেপ্টেম্বরে পুনরায় অধিবেশনে বসার কথা রয়েছে।

ভারতের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব
২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার ভারতের রুশ জ্বালানি কেনাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। তখন ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, নয়াদিল্লি রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। ওই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট মার্কিন শুল্ক বেড়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছায় এবং দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র রুশ তেল আমদানির ক্ষেত্রে ছাড় দিলে ভারত আবারও রুশ তেল কেনা শুরু করে।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুনে ভারতের রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি ৩৪ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ওই আমদানির মূল্য ছিল ৪.৫ বিলিয়ন ইউরো এবং তা রাশিয়ার মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আয়ের প্রায় ৩৬ শতাংশের সমান।
বিলটি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং চলমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে দুই দেশ এমন একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে, যার মাধ্যমে ভারতীয় রপ্তানির ওপর সামগ্রিক শুল্ক ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল করার পর ভারতীয় পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক কার্যকর রয়েছে। তবে এই হার সাময়িক এবং নির্ধারিত সময় শেষে এর পরিবর্তন হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















