ব্রিটেনে অর্থনীতি ও জনসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ক্ষমতায় এসেই গত চার দশকের অর্থনৈতিক নীতির কড়া সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সময় শুরু হওয়া ব্যাপক বেসরকারিকরণের নীতিকে তিনি দেশের বর্তমান অনেক সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, আবাসনসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত মৌলিক সেবাগুলো শুধু বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ সব সময় রক্ষা হয় না। তাই এসব খাতে সরকারের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
মাত্র এক মাস আগেও অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ছিলেন ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র। সে সময় তিনি জাতীয় রাজনীতির প্রথম সারির নেতা ছিলেন না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং এখন পুরো ব্রিটেনের অর্থনৈতিক কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। যদিও তাঁর এই পরিকল্পনার সব বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবু তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই একটি ১০ বছরের রূপরেখা প্রকাশ করা হবে। সেই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হবে মানুষের জন্য অপরিহার্য সেবাগুলোর খরচ কমানো, সেবার মান উন্নত করা এবং সরকারের জবাবদিহিতা ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো।

বার্নহ্যাম বারবার “জননিয়ন্ত্রণ” বা পাবলিক কন্ট্রোল বাড়ানোর কথা বলছেন। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, জননিয়ন্ত্রণ মানেই সব প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রায়ত্ত করা নয়। তাঁর মতে, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে জনগণের স্বার্থই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও সরকারের সরাসরি মালিকানা থাকতে পারে, আবার কোথাও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি থাকবে। ফলে “জননিয়ন্ত্রণ” বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তা নিয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি ও ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
এই বিতর্কের শিকড় রয়েছে ১৯৮০-এর দশকে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। সরকার বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, বিমানবন্দর, পানি এবং আরও অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতের কাছে বিক্রি করে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিযোগিতা বাড়ানো, দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং সাধারণ মানুষকে শেয়ারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় যুক্ত করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই বড় বড় বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সুবিধা পায়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বেসরকারিকরণ একদিকে যেমন ব্রিটেনের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করেছে, তেমনি অন্যদিকে নতুন কিছু সমস্যারও জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ইংল্যান্ডের বহু শিল্পাঞ্চলে কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, কর্মসংস্থান কমে যায় এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়ে যায়। দেশের অর্থনীতি ক্রমেই লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকেন্দ্রিক আর্থিক ও সেবাভিত্তিক খাতে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। ফলে দেশের অনেক অঞ্চল উন্নয়নের মূল ধারার বাইরে থেকে যায়।

প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম মনে করেন, সেই সময় নেওয়া অনেক সিদ্ধান্তের প্রভাব আজও দেশের মানুষ বহন করছে। তাঁর ভাষায়, রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে, অর্থনৈতিক ক্ষমতা চলে গেছে বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে এবং শিল্পনির্ভর বহু এলাকা এখনো আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। তাই তিনি এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চান, যেখানে রাষ্ট্র আবার মানুষের মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এ নিয়ে একমত হওয়া যায়নি। কমন ওয়েলথ থিংক ট্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথিউ লরেন্স মনে করেন, সরকারি মালিকানা কোনো অলৌকিক সমাধান নয়, তবে প্রয়োজন হলে এটি কার্যকর একটি উপায় হতে পারে। তাঁর মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লাভ জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা সম্ভব হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও সরকার সুবিধা পায়।
অন্যদিকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জননীতি বিভাগের অধ্যাপক ডায়ান কয়েলের মত ভিন্ন। তাঁর মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক সরকার নাকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো বাজারের কাঠামো, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে সেবার মান উন্নত হতে পারে এবং ভোক্তারাও ভালো সুবিধা পেতে পারেন।
এদিকে ব্রিটেনে ইতোমধ্যেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকার দেশের রেলব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে আবার সরকারি মালিকানায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিভিন্ন বেসরকারি ট্রেন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে একত্র করে “গ্রেট ব্রিটিশ রেলওয়েজ” নামে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে আনার কাজ চলছে। একই সময়ে আর্থিক সংকটে পড়া ব্রিটিশ স্টিলকেও সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত করে, যাতে দেশের শেষ কয়েকটি ইস্পাত উৎপাদনকারী কারখানা বন্ধ হয়ে না যায়।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে পানি খাত। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের পানি কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণভাবে বেসরকারিকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি বিল, নদী-খালে দূষণ, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রায় সব বড় পানি কোম্পানির বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ উঠেছে এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্তও হয়েছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো দেশের বৃহত্তম পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান টেমস ওয়াটার। বিপুল ঋণের বোঝায় জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর ধরেই আর্থিক সংকটে রয়েছে। বর্তমানে তাদের হাতে বছরের শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম চালানোর মতো অর্থ রয়েছে। সরকার সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির ঋণদাতাদের উদ্ধার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেকের মতে, টেমস ওয়াটার নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতে পুরো পানি খাতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
যদিও জনমত জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের অধিকাংশ মানুষ পানি ও জ্বালানি খাত সরকারি নিয়ন্ত্রণে দেখতে চান, তবুও বিশ্লেষকদের ধারণা, ব্যাপক রাষ্ট্রায়ত্তকরণের পথে হাঁটবে না নতুন সরকার। বরং এমন একটি মডেল গড়ে তোলা হতে পারে, যেখানে সরকার নীতিনির্ধারণ, মূল্য নির্ধারণ, সেবার মান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম ও চুক্তির আওতায় সেবা পরিচালনা করবে।
ম্যানচেস্টরে বাস পরিবহন ব্যবস্থায় বার্নহ্যাম ইতোমধ্যেই এমন একটি মডেল চালু করেছেন। সেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ রুট, ভাড়া এবং সেবার মান নির্ধারণ করে, আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরিচালনার দায়িত্ব পায়। ধারণা করা হচ্ছে, জাতীয় পর্যায়েও তিনি একই ধরনের নীতি অনুসরণ করতে পারেন।
সব মিলিয়ে ব্রিটেন এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন দেশটির অর্থনৈতিক দর্শন নতুন মোড় নিতে পারে। আগামী দিনে সরকার কতটা নিয়ন্ত্রণ নেবে, বেসরকারি খাতের ভূমিকা কী হবে এবং সাধারণ মানুষ এর কতটা সুফল পাবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ব্রিটেনের নতুন অর্থনৈতিক মডেলের ভবিষ্যৎ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















