০৮:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬
ট্রাম্পের নতুন নিশানায় ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’: ইরানের গোপন পারমাণবিক ঘাঁটি নিয়ে কেন বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা? ট্রাম্পের অভিযোগ ভেঙে পড়ল, আদালতে সরকারের স্বীকারোক্তি: ভাঙচুর নয়, তড়িঘড়ি মেরামতের ভুলেই ক্ষতিগ্রস্ত লিংকন রিফ্লেক্টিং পুল গোলাপি ডোরাকাটা রহস্যের অবসান: ৪০ বছরের অনুসন্ধানে মিলল সমুদ্রের নতুন শৈবাল প্রজাতি মৃত্যুর দিকে ছুটে চলা জীবনে থামার সময় কি এখনও আসেনি? প্যাক্স সিলিকা: কর্মসংস্থান নাকি নতুন নির্ভরতা? ফিলিপাইনের সামনে সুযোগের পাশাপাশি বড় ঝুঁকির সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গরের ঢাকা সফর শেষ, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও জোরদারের অঙ্গীকার সঙ্গীতের গণ্ডি ভেঙে নিজেদের পথ: স্বাধীন ব্যান্ড দ্য অ্যারিস্টোক্র্যাটসের সাফল্যের গল্প যুদ্ধের পরিসংখ্যানের আড়ালে যে মানুষগুলো থাকে ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের বিশ্বকাপ আক্ষেপ: ৪৫৪ অভিষেক, ১৫ কোচ, তবু অধরাই শিরোপা ব্রড পিকে তুষারধস: নিখোঁজ ৭ আরোহীর সন্ধানে আবারও উদ্ধার অভিযান, তিনজনের মরদেহ উদ্ধার

ভক্সওয়াগেনের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন কেন মাটিতেই থেমে গেল: চীনে উড়ন্ত গাড়ির প্রকল্পের উত্থান, সংকট ও পতন

চীনের গাড়ির বাজারে একসময় ভক্সওয়াগেন ছিল প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের যুগে প্রতিষ্ঠানটি শুধু সড়কে নয়, আকাশেও নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে শুরু করেছিল। সেই স্বপ্ন ছিল এমন এক বৈদ্যুতিক উড়ন্ত যান তৈরির, যা ধনী যাত্রীদের শহর থেকে শহরে দ্রুত, নীরব ও বিলাসবহুল যাতায়াতের সুযোগ করে দেবে। কয়েক বছরের গবেষণা, একাধিক প্রোটোটাইপ, চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং বিপুল বিনিয়োগের পরও শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি আর বাস্তব রূপ পায়নি। বরং এটি পরিণত হয়েছে ব্যবসায়িক কৌশল, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং মেধাস্বত্ব নিয়ে জটিল আইনি বিরোধের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণে।

ভবিষ্যতের পরিবহনে বড় বাজি

দুই হাজার উনিশ সালে ভক্সওয়াগেন চীনে একটি বিশেষ উদ্ভাবনী দল গঠন করে। লক্ষ্য ছিল ব্যাটারিচালিত উল্লম্বভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে সক্ষম একটি আধুনিক উড়ন্ত যান তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা ছিল, ভবিষ্যতের নগর পরিবহনে এমন যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে বড় শহরের যানজট এড়িয়ে স্বল্প সময়ে দূরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা বিশাল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, উড়ন্ত যানটিতে চারজন যাত্রী আরামদায়ক পরিবেশে ভ্রমণ করতে পারবেন। শব্দ হবে প্রচলিত হেলিকপ্টারের তুলনায় অনেক কম এবং পুরো অভিজ্ঞতাই হবে বিলাসবহুল।

Volkswagen launches prototype for Flying Tiger electric flying car

কেন চীনকে বেছে নিয়েছিল ভক্সওয়াগেন

প্রকল্পটির কেন্দ্র হিসেবে চীনকে বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল একটি স্পষ্ট কারণ। বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি প্রযুক্তি, ড্রোন এবং নতুন ধরনের উড্ডয়ন প্রযুক্তিতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। ভক্সওয়াগেনের ধারণা ছিল, স্থানীয় প্রযুক্তি ও প্রকৌশল দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারলে ইউরোপের তুলনায় অনেক দ্রুত নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে।

এই লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটি একদল তরুণ চীনা প্রকৌশলীকে নিয়ে বেইজিংয়ে একটি ছোট গবেষণা দল গঠন করে এবং বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করে।

দ্রুত বদলে যায় প্রতিযোগিতার চিত্র

ভক্সওয়াগেন যখন প্রকল্প শুরু করে, তখন উড়ন্ত যান শিল্প এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। কিন্তু অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।

চীন সরকার নিম্ন আকাশপথভিত্তিক অর্থনীতিকে ভবিষ্যতের কৌশলগত শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে দেশজুড়ে ড্রোন, আকাশযান এবং নগরভিত্তিক উড়ন্ত পরিবহন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়তে থাকে। সরকারি সহায়তা, গবেষণা অবকাঠামো এবং শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থার কারণে একের পর এক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বাজারে আসে।

যেখানে ভক্সওয়াগেনকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ করপোরেট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছিল, সেখানে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেক দ্রুত নতুন নকশা, পরীক্ষা এবং উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছিল।

Volkswagen Plans $12 Billion Electric-Car Blitz in China - WSJ

অংশীদার খোঁজার পথে একের পর এক বাধা

উড়ন্ত যান তৈরির জন্য ভক্সওয়াগেন একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে। কিন্তু প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নতুন সমস্যা দেখা দেয়।

কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কোথাও নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি সামনে আসে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামরিক শিল্পের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এসব কারণে বারবার নতুন অংশীদার খুঁজতে হয় এবং প্রকল্পের পরিকল্পনাও পরিবর্তন করতে হয়।

পরে একটি চীনা ড্রোন ও হালকা উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় একাধিক পূর্ণাঙ্গ নমুনা তৈরি করা হলেও সেগুলো বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

নকশা থেকে আদালত পর্যন্ত

প্রকল্প চলাকালে একটি চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভক্সওয়াগেনের সম্পর্ক তীব্র আইনি বিরোধে রূপ নেয়। অভিযোগ ওঠে, যৌথভাবে তৈরি করা নকশা ও প্রযুক্তিগত তথ্য যথাযথ অনুমতি ছাড়াই অন্য অংশীদারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি সালিশি, দেওয়ানি মামলা এবং পরে ফৌজদারি তদন্ত পর্যন্ত গড়ায়। এতে ভক্সওয়াগেনের এক জ্যেষ্ঠ চীনা প্রকল্প ব্যবস্থাপকও তদন্তের আওতায় আসেন। প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ অস্বীকার করলেও এই ঘটনা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

বদলে যাচ্ছে মেধাস্বত্বের লড়াই

দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করত, চীনে প্রযুক্তি নকল হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু এখন চিত্রটি বদলাচ্ছে।

Volkswagen showcases working prototype of electric flying car

চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই নতুন উদ্ভাবনের মালিক হয়ে উঠছে এবং সেই উদ্ভাবন রক্ষায় আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মেধাস্বত্ব নিয়ে আইনি লড়াইও নতুন রূপ নিচ্ছে।

বাজারের বাস্তবতাই শেষ সিদ্ধান্ত

প্রকল্পের শেষ দিকে ভক্সওয়াগেনের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা সম্ভাব্য লাভ, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে।

সে সময় চীনের গাড়ির বাজারে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি দ্রুত কমছিল। স্থানীয় ব্র্যান্ড বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। ফলে ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্তে আসে, মূল ব্যবসাকে শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

অবশেষে দুই হাজার চব্বিশ সালে উড়ন্ত গাড়ির প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

প্রতিযোগীরা কিন্তু থেমে নেই

ভক্সওয়াগেন পিছিয়ে গেলেও চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠান এখনও উড়ন্ত যান বাজারে আনার প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে, কেউ আবার বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বিশ্বের আরও কয়েকটি বড় প্রযুক্তি ও গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও এই খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।

China's Xpeng expects to start full-scale delivery of 'flying' cars in 2027 | Reuters

তবে এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও উড়ন্ত গাড়ি সাধারণ মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি। নিরাপত্তা, ব্যয়, অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন—সব মিলিয়ে এই শিল্প এখনও সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে।

ভবিষ্যতের জন্য বড় শিক্ষা

ভক্সওয়াগেনের এই প্রকল্প দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু অর্থ ও অভিজ্ঞতা থাকলেই প্রযুক্তির নতুন দৌড়ে সফল হওয়া যায় না। দ্রুত সিদ্ধান্ত, স্থানীয় বাস্তবতা বোঝা, শক্তিশালী অংশীদার নির্বাচন এবং পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতাই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় সাফল্য নির্ধারণ করবে।

একই সঙ্গে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিও নতুন বাজারে পিছিয়ে পড়তে পারে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্পের নতুন নিশানায় ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’: ইরানের গোপন পারমাণবিক ঘাঁটি নিয়ে কেন বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা?

ভক্সওয়াগেনের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন কেন মাটিতেই থেমে গেল: চীনে উড়ন্ত গাড়ির প্রকল্পের উত্থান, সংকট ও পতন

০৪:৫৩:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

চীনের গাড়ির বাজারে একসময় ভক্সওয়াগেন ছিল প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের যুগে প্রতিষ্ঠানটি শুধু সড়কে নয়, আকাশেও নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে শুরু করেছিল। সেই স্বপ্ন ছিল এমন এক বৈদ্যুতিক উড়ন্ত যান তৈরির, যা ধনী যাত্রীদের শহর থেকে শহরে দ্রুত, নীরব ও বিলাসবহুল যাতায়াতের সুযোগ করে দেবে। কয়েক বছরের গবেষণা, একাধিক প্রোটোটাইপ, চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং বিপুল বিনিয়োগের পরও শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি আর বাস্তব রূপ পায়নি। বরং এটি পরিণত হয়েছে ব্যবসায়িক কৌশল, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং মেধাস্বত্ব নিয়ে জটিল আইনি বিরোধের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণে।

ভবিষ্যতের পরিবহনে বড় বাজি

দুই হাজার উনিশ সালে ভক্সওয়াগেন চীনে একটি বিশেষ উদ্ভাবনী দল গঠন করে। লক্ষ্য ছিল ব্যাটারিচালিত উল্লম্বভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে সক্ষম একটি আধুনিক উড়ন্ত যান তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা ছিল, ভবিষ্যতের নগর পরিবহনে এমন যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে বড় শহরের যানজট এড়িয়ে স্বল্প সময়ে দূরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা বিশাল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, উড়ন্ত যানটিতে চারজন যাত্রী আরামদায়ক পরিবেশে ভ্রমণ করতে পারবেন। শব্দ হবে প্রচলিত হেলিকপ্টারের তুলনায় অনেক কম এবং পুরো অভিজ্ঞতাই হবে বিলাসবহুল।

Volkswagen launches prototype for Flying Tiger electric flying car

কেন চীনকে বেছে নিয়েছিল ভক্সওয়াগেন

প্রকল্পটির কেন্দ্র হিসেবে চীনকে বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল একটি স্পষ্ট কারণ। বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি প্রযুক্তি, ড্রোন এবং নতুন ধরনের উড্ডয়ন প্রযুক্তিতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। ভক্সওয়াগেনের ধারণা ছিল, স্থানীয় প্রযুক্তি ও প্রকৌশল দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারলে ইউরোপের তুলনায় অনেক দ্রুত নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে।

এই লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটি একদল তরুণ চীনা প্রকৌশলীকে নিয়ে বেইজিংয়ে একটি ছোট গবেষণা দল গঠন করে এবং বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করে।

দ্রুত বদলে যায় প্রতিযোগিতার চিত্র

ভক্সওয়াগেন যখন প্রকল্প শুরু করে, তখন উড়ন্ত যান শিল্প এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। কিন্তু অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।

চীন সরকার নিম্ন আকাশপথভিত্তিক অর্থনীতিকে ভবিষ্যতের কৌশলগত শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে দেশজুড়ে ড্রোন, আকাশযান এবং নগরভিত্তিক উড়ন্ত পরিবহন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়তে থাকে। সরকারি সহায়তা, গবেষণা অবকাঠামো এবং শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থার কারণে একের পর এক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বাজারে আসে।

যেখানে ভক্সওয়াগেনকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ করপোরেট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছিল, সেখানে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেক দ্রুত নতুন নকশা, পরীক্ষা এবং উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছিল।

Volkswagen Plans $12 Billion Electric-Car Blitz in China - WSJ

অংশীদার খোঁজার পথে একের পর এক বাধা

উড়ন্ত যান তৈরির জন্য ভক্সওয়াগেন একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে। কিন্তু প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নতুন সমস্যা দেখা দেয়।

কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কোথাও নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি সামনে আসে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামরিক শিল্পের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এসব কারণে বারবার নতুন অংশীদার খুঁজতে হয় এবং প্রকল্পের পরিকল্পনাও পরিবর্তন করতে হয়।

পরে একটি চীনা ড্রোন ও হালকা উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় একাধিক পূর্ণাঙ্গ নমুনা তৈরি করা হলেও সেগুলো বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

নকশা থেকে আদালত পর্যন্ত

প্রকল্প চলাকালে একটি চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভক্সওয়াগেনের সম্পর্ক তীব্র আইনি বিরোধে রূপ নেয়। অভিযোগ ওঠে, যৌথভাবে তৈরি করা নকশা ও প্রযুক্তিগত তথ্য যথাযথ অনুমতি ছাড়াই অন্য অংশীদারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি সালিশি, দেওয়ানি মামলা এবং পরে ফৌজদারি তদন্ত পর্যন্ত গড়ায়। এতে ভক্সওয়াগেনের এক জ্যেষ্ঠ চীনা প্রকল্প ব্যবস্থাপকও তদন্তের আওতায় আসেন। প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ অস্বীকার করলেও এই ঘটনা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

বদলে যাচ্ছে মেধাস্বত্বের লড়াই

দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করত, চীনে প্রযুক্তি নকল হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু এখন চিত্রটি বদলাচ্ছে।

Volkswagen showcases working prototype of electric flying car

চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই নতুন উদ্ভাবনের মালিক হয়ে উঠছে এবং সেই উদ্ভাবন রক্ষায় আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মেধাস্বত্ব নিয়ে আইনি লড়াইও নতুন রূপ নিচ্ছে।

বাজারের বাস্তবতাই শেষ সিদ্ধান্ত

প্রকল্পের শেষ দিকে ভক্সওয়াগেনের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা সম্ভাব্য লাভ, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে।

সে সময় চীনের গাড়ির বাজারে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি দ্রুত কমছিল। স্থানীয় ব্র্যান্ড বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। ফলে ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্তে আসে, মূল ব্যবসাকে শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

অবশেষে দুই হাজার চব্বিশ সালে উড়ন্ত গাড়ির প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

প্রতিযোগীরা কিন্তু থেমে নেই

ভক্সওয়াগেন পিছিয়ে গেলেও চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠান এখনও উড়ন্ত যান বাজারে আনার প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে, কেউ আবার বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বিশ্বের আরও কয়েকটি বড় প্রযুক্তি ও গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও এই খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।

China's Xpeng expects to start full-scale delivery of 'flying' cars in 2027 | Reuters

তবে এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও উড়ন্ত গাড়ি সাধারণ মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি। নিরাপত্তা, ব্যয়, অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন—সব মিলিয়ে এই শিল্প এখনও সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে।

ভবিষ্যতের জন্য বড় শিক্ষা

ভক্সওয়াগেনের এই প্রকল্প দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু অর্থ ও অভিজ্ঞতা থাকলেই প্রযুক্তির নতুন দৌড়ে সফল হওয়া যায় না। দ্রুত সিদ্ধান্ত, স্থানীয় বাস্তবতা বোঝা, শক্তিশালী অংশীদার নির্বাচন এবং পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতাই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় সাফল্য নির্ধারণ করবে।

একই সঙ্গে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিও নতুন বাজারে পিছিয়ে পড়তে পারে।