মাতৃত্বকে ঘিরে আমাদের সমাজে আবেগ, প্রত্যাশা ও উদযাপনের কমতি নেই। কিন্তু সন্তান জন্মের পর একজন নারীর নিজের শরীর ও মনের ওপর যে বিপুল চাপ তৈরি হয়, তার দিকে আমরা কতটা নজর দিই? শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন থাকে—ওজন কত, দুধ ঠিকমতো খাচ্ছে কি না, ঘুমাচ্ছে কি না। অথচ যে নারীটি রাতের পর রাত জেগে সেই শিশুর যত্ন নিচ্ছেন, তার মানসিক অবস্থা কেমন, তিনি ভয় পাচ্ছেন কি না, ভেঙে পড়ছেন কি না—এই প্রশ্নগুলো প্রায়ই অনুপস্থিত।
লিন্ডসে ক্ল্যান্সির মামলাটি এই অদৃশ্য সংকটকে ভয়াবহভাবে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের এই সাবেক প্রসব ও সন্তান জন্মদান ইউনিটের নার্স তার তিন সন্তানকে হত্যার কথা অস্বীকার করেননি। তার প্রতিরক্ষা পক্ষের বক্তব্য, তৃতীয় সন্তানের জন্মের পর তিনি প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিসে আক্রান্ত ছিলেন। অথচ তার অসুস্থতার লক্ষণ আগেই স্পষ্ট হয়েছিল। তিনি চিকিৎসা নিয়েছিলেন, বিভিন্ন ওষুধ পেয়েছিলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধী হটলাইনে ফোন করেছিলেন এবং মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হয়েছিলেন। এমনকি পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন যে সন্তানদের ক্ষতি করার চিন্তা তাকে তাড়া করছে।
তারপরও পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি সন্তানদের হত্যা করেন এবং নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। সেই প্রচেষ্টায় তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। এখন আদালতকে নির্ধারণ করতে হবে তিনি তার কর্মকাণ্ডের জন্য অপরাধমূলকভাবে দায়ী ছিলেন কি না। কিন্তু আদালতের বাইরেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়—একজন মা যখন বারবার সাহায্যের সংকেত দেন, তখন তার চারপাশের ব্যবস্থা কেন তাকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে পারে না?
মাতৃত্বের সুখের আড়ালে যে অন্ধকার
ক্ল্যান্সির বিচারের বাইরে আদালতের সামনে জড়ো হওয়া শত শত নারী আরেকটি বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। তাদের কেউ নিজেরাই গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পর মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন। কেউ চিকিৎসা বা সামাজিক সহায়তার অভাবে একা লড়েছেন। আবার কারও মনে হয়েছে—এমন পরিস্থিতি তাদের সঙ্গেও ঘটতে পারত।
এই অনুভূতিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ মাতৃত্বকে আমরা প্রায়ই এমন এক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করি, যেখানে একজন নারী স্বাভাবিকভাবেই আনন্দিত, পরিপূর্ণ ও আত্মবিশ্বাসী থাকবেন। বাস্তবে সন্তান জন্মের পর ভয়, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অপরাধবোধ কিংবা শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারার মতো অনুভূতিও দেখা দিতে পারে।
ভারতে শ্ৰেয়া মিত্রের অভিজ্ঞতা তারই একটি উদাহরণ। সন্তান জন্মের ২০ দিনের মধ্যে তার প্রথম তীব্র উদ্বেগের আক্রমণ হয়। হাত কাঁপত, হৃদস্পন্দন বেড়ে যেত, মনে হতো যেন হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। পরিবার পাশে থাকা সত্ত্বেও একাধিক চিকিৎসকের পরামর্শ ও নানা পরীক্ষা করিয়েও সমস্যার কারণ ধরা পড়েনি। শেষ পর্যন্ত একজন নিউরোলজিস্ট তাকে জানান, তিনি প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগছেন। রোগটির নাম জানার পর এবং চিকিৎসা শুরু হওয়ার পরই তার অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল, বাইরে থেকে তার জীবনকে সম্পূর্ণ সুখী মনে হতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের ছবি দেখে সবাই প্রশংসা করত। কিন্তু সেই ছবির আড়ালে চলছিল এক নারীর মানসিক সংগ্রাম। অর্থাৎ একটি হাসিমুখের পারিবারিক ছবি কোনোভাবেই প্রমাণ করে না যে মা মানসিকভাবে ভালো আছেন।
কতটা স্বাভাবিক, আর কখন তা চিকিৎসার বিষয়?
সন্তান জন্মের পর সাময়িকভাবে মন খারাপ বা অস্থিরতা অনেক নারীরই হতে পারে। হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের ঘাটতি, বুকের দুধ খাওয়ানো এবং নতুন দায়িত্বের চাপ এ সময় বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক নারী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই ‘বেবি ব্লুজ’ থেকে বেরিয়ে আসেন।
কিন্তু সব মানসিক সমস্যা এত সহজে শেষ হয় না। প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় গভীর মন খারাপ, কোনো কিছুতে আগ্রহ না থাকা এবং নিজের মাতৃত্ব নিয়ে অবিরাম উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। তখন চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে—থেরাপি, ওষুধ অথবা দুটির সমন্বয়ে।
আর প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিস আরও গুরুতর একটি জরুরি মানসিক অবস্থা। এটি বিরল হলেও আক্রান্ত নারী কণ্ঠস্বর শুনতে পারেন, হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রমে ভুগতে পারেন এবং বাস্তবতা বিচার করার ক্ষমতা হারাতে পারেন। এমন অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা অত্যাবশ্যক।
সমস্যা হলো, পরিবার কিংবা সমাজ অনেক সময় এই পার্থক্যগুলো বোঝে না। ফলে গুরুতর লক্ষণকেও ‘নতুন মা হওয়ার স্বাভাবিক কষ্ট’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়।
প্রসবের পর মায়ের জন্য চিকিৎসাব্যবস্থা কোথায়?
গর্ভাবস্থায় একজন নারী নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যান। প্রসবের সময় যত এগিয়ে আসে, চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবধানও কমে। কিন্তু সন্তান জন্মের পর এই নজরদারি দ্রুত কমে যায়। সাধারণত ছয় সপ্তাহের মাথায় একটি ফলো-আপের পর অনেক নতুন মা যেন নিজেদের মতো করে পথ চলতে বাধ্য হন।

এখানেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়।
শিশুর জন্মের পর মায়ের শারীরিক পুনরুদ্ধার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার মানসিক সুস্থতাও তেমন গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসককে তাই শুধু রক্তচাপ, রক্তপাত বা শারীরিক জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন করলে চলবে না। মায়ের ঘুম হচ্ছে কি না, তিনি অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন কি না, সবসময় মন খারাপ থাকে কি না, শিশুর প্রতি অস্বাভাবিক ভয় বা বিরক্তি তৈরি হয়েছে কি না—এসবও নিয়মিত জানতে হবে।
কারণ একজন মা নিজে থেকে সবসময় বলতে পারবেন না যে তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। কখনো তিনি সমস্যাটিই চিনতে পারবেন না।
সামাজিক বিচার নয়, প্রয়োজন সহায়তা
প্রসব-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো সামাজিক কলঙ্ক। ‘আমাদের সময়েও তো সন্তান হয়েছে’, ‘আমরাও পাঁচটা সন্তান মানুষ করেছি’, ‘তোমাকে একটু শক্ত হতে হবে’—এই কথাগুলো হয়তো অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে বলা হয়, কিন্তু অনেক সময় তা সাহায্যের বদলে সমস্যাকে আরও গভীর করে।
মাতৃত্ব কোনো প্রতিযোগিতা নয়। আগের প্রজন্ম কীভাবে পরিস্থিতি সামলেছে, তা দিয়ে বর্তমান একজন নারীর মানসিক অবস্থাকে বিচার করা যায় না।
সবচেয়ে জরুরি হলো, কোনো নারী যখন বলেন ‘আমি ভালো নেই’, তখন তাকে বিশ্বাস করা। তার অভিযোগকে দুর্বলতা বা অতিরিক্ত আবেগ হিসেবে না দেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পথ খুলে দেওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যকে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের দেশেও প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতাজনিত সমস্যার হার উল্লেখযোগ্য এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে তা আরও বেশি। স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ যাদের কম, তাদের ঝুঁকিও বেশি।
অর্থাৎ এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বা নির্দিষ্ট শ্রেণির সমস্যা নয়। এটি মাতৃস্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরিবর্তন দরকার চিকিৎসাব্যবস্থাতেও
কিছু জায়গায় ইতিমধ্যে পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ভারতের তেলেঙ্গানা, কেরালা ও তামিলনাড়ুর কিছু হাসপাতাল অ্যান্টেনাটাল ক্লিনিকেই মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করছে। মাতৃত্ব ও নবজাতক সেবার মান উন্নয়নের কিছু প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও চিকিৎসক, নার্স ও প্রশাসনিক কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
কিন্তু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দিয়ে এই সংকট সামলানো যাবে না। প্রয়োজন একটি নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা।
গর্ভাবস্থার শুরু থেকে সন্তান জন্মের পর কয়েক মাস পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যের স্ক্রিনিংকে চিকিৎসার নিয়মিত অংশ করতে হবে। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সেলরের কাছে যাওয়ার সহজ সুযোগ থাকতে হবে। পরিবারকেও জানতে হবে কোন লক্ষণগুলো সাধারণ ক্লান্তি, আর কোনগুলো চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সংকেত।
সবচেয়ে বড় কথা, নতুন মাকে একা ফেলে রাখা যাবে না।
একটি শিশুকে বড় করতে যেমন একটি সামাজিক পরিমণ্ডল প্রয়োজন, তেমনি মায়ের সুস্থতার জন্যও প্রয়োজন একটি সহায়ক পরিসর। পরিবারের কেউ তাকে কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ করে দিতে পারেন। কেউ তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। কেউ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। আর কেউ যদি বুঝতে পারেন পরিস্থিতি গুরুতর, তাহলে দ্রুত পেশাদার সাহায্য নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন।
মাতৃত্বকে সত্যিকার অর্থে সম্মান করতে হলে
সন্তানের জন্ম নিঃসন্দেহে একটি পরিবারের আনন্দের ঘটনা। কিন্তু সেই আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নারীটি যেন অদৃশ্য হয়ে না যান।
লিন্ডসে ক্ল্যান্সির মামলার বিচার আদালত করবে। তার মানসিক অবস্থার আইনি মূল্যায়নও আদালতের বিষয়। কিন্তু এই ঘটনাকে শুধু একটি ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে দেখলে আমরা এর বৃহত্তর সামাজিক শিক্ষা হারাব। একজন মা যখন সাহায্য চান, তখন পরিবার, চিকিৎসাব্যবস্থা ও সমাজ তাকে কতটা শুনছে—এই প্রশ্নটিও আমাদের করতে হবে।
মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করার চেয়ে মাকে মানুষ হিসেবে দেখা বেশি জরুরি।
কারণ একটি শিশুর ভালো থাকার সঙ্গে তার মায়ের মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক গভীর। তাই শিশুর জন্য যতটা যত্ন, মায়ের জন্যও ততটাই সহায়তা দরকার। ভালো মা হওয়ার চাপ নয়—প্রয়োজনে সাহায্য পাওয়ার অধিকারই হওয়া উচিত মাতৃত্বের স্বাভাবিক অংশ।
নামিতা ভান্ডারে 




















