প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইন্দোনেশিয়ার জন্য কোনো আকস্মিক ব্যতিক্রম নয়; বরং ভূপ্রকৃতির কারণেই এটি দেশটির প্রায় স্থায়ী বাস্তবতা। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থান করায় ভূমিকম্প, সুনামি, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ভূমিধসের ঝুঁকি বহু অঞ্চলে দীর্ঘদিনের। ফলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি সেখানে বিলাসিতা নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দায়িত্ব।
পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের সাম্প্রতিক ভূমিকম্প সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। ১৫ আগস্ট ফ্লোরেস দ্বীপের কাছে নাজেও এলাকায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশটির আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান সংস্থা বিএমকেজি ৭ হাজার ৪৯২টি পরাঘাত রেকর্ড করে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ২।
দুর্যোগের মানবিক মূল্যও ছিল ভয়াবহ। ২৫ আগস্ট পর্যন্ত জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বিএনপিবির হিসাবে ১০৫ জন নিহত, ১ হাজার ৬৭৮ জন আহত এবং প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৭৮ হাজার ঘরবাড়ি। পাশাপাশি ১১৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১ হাজার ৩৭৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৪৮৩টি সরকারি ভবন, ৪০২টি উপাসনালয় এবং ১৫৬টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই বিপর্যয় শুধু একটি ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ নয়। এটি রাষ্ট্রের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাঠামো নিয়ে অন্তত তিনটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।
রাষ্ট্রের উপস্থিতি কত দ্রুত?
প্রথম প্রশ্নটি রাজনৈতিক। ভূমিকম্পের ১১ দিন পর, ২৬ আগস্ট প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো নাজেও পরিদর্শনে যান। প্রেসিডেন্টের ব্যাখ্যা ছিল, দুর্যোগের প্রথম পর্যায়ে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি উপস্থিতি উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর কাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
এই যুক্তির প্রশাসনিক ভিত্তি থাকতে পারে। কিন্তু দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রের ভূমিকা শুধু প্রশাসনিক দক্ষতার হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। যারা স্বজন হারিয়েছেন, ঘর হারিয়েছেন, জীবিকা হারিয়েছেন, তাদের কাছে রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতি এক ধরনের মানসিক আশ্বাস। বিশেষ করে দেশের প্রান্তিক ও অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলে এমন উপস্থিতি নাগরিকদের মনে এই বার্তা দেয় যে রাজধানী থেকে বহু দূরের মানুষের দুর্দশাও রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে ২০২৫ সালের নভেম্বরের অভিজ্ঞতার কারণে। সে সময় আচেহ, উত্তর সুমাত্রা ও পশ্চিম সুমাত্রায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। পরে কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছিলেন যে আগের বাজেট সংকোচনের ফলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছিল। বিদেশি সহায়তা গ্রহণ নিয়েও সরকারের অনীহা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাজেটই প্রথম প্রতিরক্ষা
এখানেই দ্বিতীয় এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে—দুর্যোগ মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়ার আর্থিক প্রস্তুতি কতটা শক্তিশালী?
পরিসংখ্যানটি উদ্বেগজনক। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিএনপিবির বরাদ্দ ১১ দশমিক ৭৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়ায় পৌঁছেছিল। পরবর্তী চার বছরেও বরাদ্দ ছিল তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য—২০২১ সালে ৭ দশমিক ১৪ ট্রিলিয়ন, ২০২২ সালে ৫ দশমিক ০৫ ট্রিলিয়ন, ২০২৩ সালে ৫ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন এবং ২০২৪ সালে ৪ দশমিক ৯২ ট্রিলিয়ন রুপিয়া।
কিন্তু এরপর পতন দ্রুত হয়েছে। ২০২৫ সালে বরাদ্দ নেমে আসে ২ দশমিক ০১ ট্রিলিয়ন রুপিয়ায়। ২০২৬ সালে তা আরও কমে মাত্র ৪৯১ বিলিয়ন রুপিয়ায় দাঁড়িয়েছে।
এমন একটি দেশে যেখানে বড় ধরনের দুর্যোগ নিয়মিত ঘটে, সেখানে এই মাত্রার বাজেট সংকোচন শুধু একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি প্রস্তুতির সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া বলেছেন, প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় সরকার জরুরি তহবিল ছাড়তে পারে। কিন্তু দুর্যোগের মুহূর্তে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়ার সক্ষমতা আর আগাম প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকা এক বিষয় নয়।
কারণ বিপর্যয়ের পর অর্থ জোগাড় করে পানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, আশ্রয়কেন্দ্র বা যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করা যায় না। এসব প্রস্তুতি আগে থেকেই থাকতে হয়।
এনটিটির ঘটনাতেই তার প্রমাণ মিলেছে। বিএনপিবি প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুহারিয়ান্তো জানিয়েছেন, রেও ও মাংগারাইসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেয়। স্থানীয় প্রশাসনের অনেকের কাছেই পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী ও আর্থিক সংস্থান ছিল না। দুর্গম ভূপ্রকৃতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।
কিন্তু দুর্গম ভূপ্রকৃতিকে ব্যর্থতার অজুহাত বানানোর সুযোগ নেই। বরং যেখানে পাহাড়, দ্বীপ, বিচ্ছিন্ন জনপদ ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেই আগাম পরিকল্পনা আরও বেশি জরুরি।

দুর্যোগের আগেই প্রতিরোধ
তৃতীয় প্রশ্নটি সবচেয়ে মৌলিক—ইন্দোনেশিয়া কি দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে বেশি অর্থ ব্যয় করছে, নাকি দুর্যোগের আগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে যথেষ্ট বিনিয়োগ করছে?
বিএনপিবি প্রধানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ধরে দুর্যোগ প্রতিরোধে সংস্থাটির বার্ষিক বরাদ্দ প্রায় ১৭ থেকে ১৯ বিলিয়ন রুপিয়ার মধ্যে রয়েছে। একটি ভূমিকম্পপ্রবণ দেশের জন্য এই পরিমাণ কতটা সীমিত, তা সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা থেকেই বোঝা যায়।
এনটিটির মানুষও প্রথমবার এমন বিপদের মুখোমুখি হয়নি। ২০২১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মাউমেরে এলাকার কাছে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করেছিল। অর্থাৎ বর্তমান বিপর্যয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একই ভৌগোলিক ঝুঁকির পুনরাবৃত্তি।
ভূমিকম্প ঠেকানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ভূমিকম্পে একটি ভবন ভেঙে পড়বে কি না, একটি রাস্তা বিচ্ছিন্ন হবে কি না, একটি হাসপাতাল কার্যকর থাকবে কি না কিংবা একটি দুর্গম এলাকায় তিন দিন না তিন ঘণ্টায় বিশুদ্ধ পানি পৌঁছাবে—এসবের অনেকটাই নির্ভর করে মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর।
তাই দুর্যোগ প্রস্তুতির অর্থ শুধু মহড়া কিংবা উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা নয়। ভূমিকম্পসহনশীল নির্মাণবিধি কঠোরভাবে কার্যকর করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, উপকূলীয় অঞ্চলে সঠিক পরিকল্পনা, বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র, নিরাপদ সরবরাহপথ এবং স্পষ্ট সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা
দুর্যোগের সময় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানো অবশ্যই জরুরি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতিও মানুষের মনোবলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় বিপর্যয়ের কয়েক দিন পর নেতারা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন কি না, শুধু তা দিয়ে নয়।
বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—ভূমিকম্প আঘাত হানার আগেই কী করা হয়েছিল?
কতগুলো ভবন নিরাপদ করা হয়েছিল? কতগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিল? কতগুলো দুর্গম এলাকায় জরুরি সরঞ্জাম মজুত রাখা হয়েছিল? স্থানীয় প্রশাসনকে কতটা সক্ষম করা হয়েছিল? এবং ঝুঁকি কমাতে কতটা অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল?
ইন্দোনেশিয়ার জন্য তাই সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের শিক্ষা খুব স্পষ্ট। দুর্যোগের পর ব্যয় করা প্রতিটি অর্থ প্রয়োজনীয়, কিন্তু দুর্যোগের আগে বিনিয়োগ করা অর্থ অনেক সময় জীবন বাঁচায়।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও তার মানবিক মূল্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সেই সক্ষমতা তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান উপস্থিতি কোনো দুর্যোগস্থলে নেতার সফর নয়; বরং দুর্যোগ আঘাত হানার বহু আগে মানুষের জন্য তৈরি করে রাখা নিরাপত্তাবলয়।
তেংগারা স্ট্র্যাটেজিকস 



















