বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থান, কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠানোর তুলনামূলক সুবিধা এবং ক্রমবর্ধমান বেসরকারি বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে লাতিন আমেরিকায় নতুন করে গতি পাচ্ছে মহাকাশ খাত। ইকুয়েডর, ব্রাজিল, ডোমিনিকান রিপাবলিক ও পেরুসহ কয়েকটি দেশ মহাকাশবন্দর নির্মাণ ও মহাকাশভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এই অঞ্চলের মহাকাশ কার্যক্রমকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
বিষুবরেখার বাড়তি সুবিধা
ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলের কাছে একটি বেসরকারি মহাকাশবন্দর তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন উদ্যোক্তা রবার্ট আইলন ও তার সহযোগীরা। অঞ্চলটি বিষুবরেখা থেকে মাত্র দুই ডিগ্রি দক্ষিণে হওয়ায় রকেট উৎক্ষেপণের জন্য জায়গাটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। পৃথিবী বিষুবরেখায় সর্বোচ্চ গতিতে ঘোরে—প্রায় ঘণ্টায় ১ হাজার ৬৭০ কিলোমিটার। ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণনের বাড়তি গতি কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম জ্বালানি খরচে রকেটকে কক্ষপথে পাঠানো এবং বেশি পেলোড বহনের সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ও ম্যাককিনসি অ্যান্ড কোম্পানির এক প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২৩ সালে ৬৩০ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতি ২০৩৫ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। স্পেসএক্সের ৭৫ বিলিয়ন ডলারের আইপিওও বেসরকারি মহাকাশ খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়িয়েছে।
ব্রাজিলের আলকান্তারা ও নতুন উদ্যোগ
লাতিন আমেরিকায় মহাকাশ উৎক্ষেপণের সম্ভাবনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ব্রাজিলের আলকান্তারা উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিষুবরেখা থেকে মাত্র ২ দশমিক ৩ ডিগ্রি দক্ষিণে অবস্থিত। ২০০৩ সালে রকেট বিস্ফোরণে ২১ জন প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ নিহত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় কেন্দ্রটি পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনোস্পেসের রকেট দিয়ে সেখানে প্রথম বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ হয়, তবে উৎক্ষেপণের এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে রকেটটি বিধ্বস্ত হয়।
২০২৪ সালে ব্রাজিল মহাকাশ কার্যক্রমসংক্রান্ত একটি আইন পাস করে, যা উৎক্ষেপণ পরিচালনাকারীদের জন্য আইনি কাঠামো আরও নিরাপদ করার পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ALADA কার্যক্রম শুরু করে। তবে অর্থায়ন এখনও বড় বাধা। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রাজিলের মহাকাশ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪৭ মিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ০০২ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা
মহাকাশ অবকাঠামোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাও লাতিন আমেরিকায় প্রভাব ফেলছে। চীন আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলাসহ অঞ্চলে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও রেডিও টেলিস্কোপের ১১টি স্থাপনা তৈরি করেছে বলে একটি মার্কিন কংগ্রেসনাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব স্থাপনার বেসামরিক ও সামরিক—দুই ধরনের ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ডোমিনিকান রিপাবলিক ২০২৮ সালের মে নাগাদ পেডারনালেসে একটি মহাকাশবন্দর চালুর পরিকল্পনা করছে। প্রকল্পটির বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ৬০০ মিলিয়ন ডলার এবং এতে চারটি উৎক্ষেপণ প্যাড রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে পেরু নাসার সঙ্গে যৌথভাবে সম্ভাব্য উৎক্ষেপণস্থল নিয়ে সমীক্ষা করছে। দেশটির পরিকল্পিত মহাকাশবন্দরের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭০ মিলিয়ন ডলার।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, শুধু বেসরকারি বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ দিয়ে একটি শক্তিশালী মহাকাশ শিল্প গড়ে উঠবে না। দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সীমিত অবকাঠামো, পরিবেশগত অনুমোদন, কর ও উড্ডয়নসংক্রান্ত বিধিবিধানসহ নানা বাধা দূর করতে হবে। ফলে লাতিন আমেরিকার নতুন মহাকাশ দৌড়ে সম্ভাবনা যেমন বড়, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও তেমনি গভীর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















