পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় ২০২৭ সালকে ঘিরে যে সতর্কতা তৈরি হয়েছে, সেটিই হয়তো পুরো চিত্রটি ধরতে পারছে না। বরং ২০২৮ সাল হতে পারে এমন একটি সময়, যখন তাইওয়ান, ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক নির্বাচন আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে একসঙ্গে নাড়িয়ে দিতে পারে। আর সেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সুযোগে চীন তার কৌশলগত লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
এমন আশঙ্কার কেন্দ্রে রয়েছে একটি আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী বিষয়—গণতান্ত্রিক নির্বাচন। ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দিয়ে শুরু হবে এই রাজনৈতিক পর্ব। মে মাসে ভোট হবে ফিলিপাইনে। আর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের যে প্রভাবশালী ভূমিকা, মার্কিন নির্বাচনের ফল সেটিকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
চীনের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উপস্থিতিকে বেইজিং এখন আর আঞ্চলিক বাস্তবতার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখতে চায় না। বরং চীনের উত্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওয়াশিংটনকে অঞ্চল থেকে পিছিয়ে যেতে দেখাই বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি আকাঙ্ক্ষা।
তাইওয়ানই প্রথম পরীক্ষা
২০২৮ সালের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে তাইওয়ান। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বেইজিংয়ের কাছে অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য। তবু তাঁর জনপ্রিয়তা এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। তিনি যদি ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির প্রার্থী হন, তাহলে সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাস তাঁর পক্ষে যেতে পারে। ২০০০ সালের পর তাইওয়ানে কোনো প্রেসিডেন্ট মাত্র এক মেয়াদ শেষে বিদায় নেননি।
লাই পুনর্নির্বাচিত হলে চীনের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ তখন কুওমিনতাং বা কেএমটি টানা চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হবে। অথচ বেইজিং তাইওয়ানে এই দলটিকেই তুলনামূলকভাবে পছন্দের রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে।
এখানেই ঝুঁকির নতুন মাত্রা তৈরি হতে পারে। লাই জয়ী হলে বেইজিং হয়তো কেএমটি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় ফিরবে—এই সম্ভাবনার অপেক্ষা না করে সরাসরি তাইওয়ানের সরকার ও ভোটারদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। সামরিক আগ্রাসনই একমাত্র পথ নয়। দ্বীপটিকে ঘিরে কোয়ারেন্টাইন বা অবরোধের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে। আর পূর্ণাঙ্গ অবরোধ কার্যত যুদ্ধেরই একটি রূপ।
অন্যদিকে কেএমটি জয়ী হলেও সংকটের সম্ভাবনা কমবে না; বরং তার ধরন বদলে যেতে পারে।
কেএমটি ক্ষমতায় এলে অভ্যন্তরীণ সংঘাত
চীনের সঙ্গে কেএমটির সম্পর্ক এখন অতীতের তুলনায় অনেক ঘনিষ্ঠ। ২০১৪ সালে চীনের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে তাইওয়ানে যে তীব্র জনবিক্ষোভ হয়েছিল, সেটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্মৃতি। ওই চুক্তির মাধ্যমে তাইওয়ানের সেবা খাতে চীনা বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল, এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্ভরতা রাজনৈতিক প্রভাবের পথ খুলে দেবে। শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সংসদ ভবন দখল করে আন্দোলন চালায় এবং কেএমটিকে চুক্তিটি প্রত্যাহার করতে হয়।
বর্তমান বাস্তবতা সেই সময়ের চেয়ে ভিন্ন। কেএমটি নেতৃত্বের সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কেএমটির বর্তমান চেয়ারওম্যান ও সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী চেং লি-ওয়েন এপ্রিল মাসে বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভবিষ্যতে তাঁকে তাইওয়ান সফরের আমন্ত্রণ জানান।
কেএমটি ক্ষমতায় ফিরে সেই আমন্ত্রণ বাস্তব রূপ পেলে তাইওয়ানের অভ্যন্তরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে চীনপন্থী বলে বিবেচিত কোনো নীতির বিরুদ্ধে নতুন সামাজিক আন্দোলন দেখা দিতে পারে।
আরও বিপজ্জনক হতে পারে খুব অল্প ব্যবধানে নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হওয়া। বিশেষ করে কেএমটি সামান্য ব্যবধানে হেরে গেলে বিরোধ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে। বেইজিং তখন তাইওয়ানের সামাজিক বিভাজনকে আরও গভীর করার সুযোগ পেতে পারে। লক্ষ্য হতে পারে তাইওয়ানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর ও অস্থিতিশীল হিসেবে তুলে ধরা।
চীনের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ
প্রশ্ন হলো, ২০২৬ বা ২০২৭ সালেই কেন চীন তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ নেবে না?
এর একটি বড় কারণ চীনের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার। ২০২৭ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ২১তম জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গুরুত্বপূর্ণ দলীয় সম্মেলনের আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেইজিং সাধারণত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। শি জিনপিংয়ের চতুর্থ মেয়াদেও কোনো স্পষ্ট উত্তরসূরি না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন অবস্থায় কংগ্রেসের আগে তাইওয়ান নিয়ে বড় ধরনের সামরিক ঝুঁকি নেওয়া তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সতর্কতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের সামরিক বাহিনীতে শির ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিপলস লিবারেশন আর্মির ভেতরেও নেতৃত্ব পর্যায়ে পরিবর্তন ও তদন্ত হয়েছে। বিশেষ নজর পড়েছে পিএলএ রকেট ফোর্সের ওপর, যেটি তাইওয়ান অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
কারণ তাইওয়ানকে ঘিরে বড় সংঘাত হলে শুধু দ্বীপটিই লক্ষ্য হবে না। জাপান, ফিলিপাইন এমনকি গুয়ামেও থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় আসতে পারে। অর্থাৎ তাইওয়ান যুদ্ধ মুহূর্তেই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
এই বাস্তবতায় ২০২৭ সালকে সামরিক অভিযানের বদলে প্রস্তুতি ও পুনর্গঠনের বছর হিসেবে ব্যবহার করা শির জন্য বেশি যুক্তিসঙ্গত হতে পারে।
ফিলিপাইনেও বদলাতে পারে হিসাব
২০২৮ সালের মে মাসের ফিলিপাইন নির্বাচনও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র এক মেয়াদের সীমাবদ্ধতার কারণে আবার নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। ফলে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, সেটি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, তাইওয়ান ও চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের মেয়ে সারা দুতার্তে সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেটি তাঁকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য করে দিতে পারে।
তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হলে ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কাছ থেকে দূরে সরে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণকে আমূল বদলে দিতে পারে।
এই আশঙ্কা থেকেই ম্যানিলা এখন জাপানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং তাইওয়ানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—২০২৮ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগেই যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের মধ্যে যত বেশি সম্ভব সহযোগিতার কাঠামো, সমঝোতা ও নীতি প্রতিষ্ঠা করা।
শেষ অনিশ্চয়তা ওয়াশিংটনে
তারপর আসবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। ২০২৮ সালের নভেম্বরে মার্কিন ভোটাররা সম্ভবত ২০১২ সালের পর প্রথমবার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ছাড়া একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেখবেন। কিন্তু এই নির্বাচনের ফল অনুমান করাই সবচেয়ে কঠিন। এখনো কোনো পক্ষেই স্পষ্ট প্রার্থী বা নিশ্চিত নেতৃত্ব সামনে নেই।
ফলে পূর্ব এশিয়ার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গণতন্ত্রের নির্বাচন একই বছরে এমন এক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করবে, যার প্রতিটি ফল আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এই কারণেই ২০২৮-কে কেবল আরেকটি নির্বাচনী বছর হিসেবে দেখা হবে ভুল। বেইজিং, তাইপে, টোকিও, ম্যানিলা ও ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে সম্ভাব্য বিভিন্ন ফলাফলের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো, রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব শক্ত করা এবং কৌশলগত সমঝোতা তৈরি—সবকিছুই সেই প্রস্তুতির অংশ।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ভোটাররাই। ২০২৮ সালে তাইওয়ান, ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবেন, তার প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করতে পারে পূর্ব এশিয়া আরও স্থিতিশীল হবে, নাকি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকটের দিকে এগিয়ে যাবে।
ক্রিস হর্টন 



















