ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য পোল্যান্ডে ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে এবার জোর দেওয়া হচ্ছে দক্ষ সেনা, প্রশিক্ষক ও যুদ্ধক্ষেত্রের নেতৃত্ব তৈরিতে। লক্ষ্য শুধু কয়েকজন সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়; বরং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা দেশে ফিরে আরও বহু সেনাকে প্রশিক্ষণ দেবেন।
সীমিত প্রশিক্ষণ, বড় প্রভাবের লক্ষ্য
নরওয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কেন্দ্র পোল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের জোমসবর্গ প্রশিক্ষণ শিবির। এখানে সাধারণ নতুন সেনাদের বদলে দলনেতা, প্লাটুন ও কোম্পানি পর্যায়ের কমান্ডার, প্রশিক্ষক এবং বিশেষজ্ঞদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের অনেকেরই যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি অভিজ্ঞতা রয়েছে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের নেতৃত্বে থাকা ব্রিগেডিয়ার আতলে মোলদে জানান, জোমসবর্গে প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত। তাই এমন ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাঁরা দেশে ফিরে নিজেদের ইউনিটের অন্য সেনাদেরও শেখাতে পারবেন।
একজন দক্ষ প্রশিক্ষক বছরে কয়েক দফায় নিজের বাহিনীর ১০ থেকে ২০ জন সেনাকে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। ফলে অল্পসংখ্যক প্রশিক্ষক তৈরি করেও ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।
ইউক্রেনের জন্য ‘গুণগত’ সহায়তা
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেনের বিশাল সেনাবাহিনীর সংখ্যার তুলনায় এই উদ্যোগ সরাসরি বড় পরিবর্তন আনবে না। তবে এর মাধ্যমে এমন সেনা তৈরি হচ্ছে, যাঁরা অন্যদের সক্ষমতা বাড়াতে পারবেন।
দলনেতা ও প্লাটুন কমান্ডাররা দেশে ফিরে নিজেদের ইউনিট পরিচালনা করবেন। প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মীরা যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রাখবেন। আর প্রশিক্ষকেরা আরও কয়েকশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবেন।
অর্থাৎ পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তার মূল লক্ষ্য এখানে সেনার সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং দক্ষতা ও নেতৃত্বের মান উন্নত করা।
যুদ্ধক্ষেত্রের নেতৃত্বে বিশেষ গুরুত্ব
প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া। প্রচলিত সামরিক পদ্ধতি, পরিকল্পনা প্রণয়ন, পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ইউক্রেনের এক সার্জেন্ট জানান, তাঁদের বাহিনী ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মতো নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। জোমসবর্গের প্রশিক্ষণ তাঁকে পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝতে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করছে।
প্রশিক্ষণ কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেনীয় সেনারা কীভাবে চলবে, নেতৃত্ব দেবে এবং নিজেদের অভিযান পরিচালনা করবে—এসব দক্ষতা আরও উন্নত করাই অন্যতম লক্ষ্য।
সোভিয়েত ধারা থেকে পশ্চিমা পদ্ধতির দিকে
এই প্রশিক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন। কর্মকর্তারা মনে করছেন, সোভিয়েত আমল থেকে চলে আসা সামরিক সংস্কৃতি ও পদ্ধতির পরিবর্তে ইউক্রেন ধীরে ধীরে পশ্চিমা সামরিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু পশ্চিমা দেশগুলো একতরফাভাবে নির্ধারণ করছে না। ইউক্রেন নিজেই কোন ক্ষেত্রে সহায়তা প্রয়োজন তা জানিয়েছে এবং সেই চাহিদার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণসূচি তৈরি করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এটি ইউক্রেনের যুদ্ধ। তাই তাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সহায়তা দেওয়াই অংশীদারদের দায়িত্ব।
দুই পক্ষই শিখছে একে অন্যের কাছ থেকে
পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে ইউক্রেন মৌলিক সামরিক কৌশল, পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের বিষয়ে দক্ষতা নিচ্ছে। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় সেনাদের যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা পশ্চিমা প্রশিক্ষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তৈরি নতুন প্রযুক্তি ও কৌশলের ব্যবহারে ইউক্রেনীয় সেনারা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। ড্রোনভিত্তিক যুদ্ধেও তাদের অভিজ্ঞতা পশ্চিমা বাহিনীর তুলনায় বেশি বলে প্রশিক্ষণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ফলে এই প্রশিক্ষণ একমুখী নয়। ইউক্রেনীয় সেনারা পশ্চিমাদের কাছ থেকে সামরিক নেতৃত্ব ও মৌলিক কৌশল শিখছে, আর পশ্চিমা প্রশিক্ষকরাও ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কিছু শিখছেন।
শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে একটি প্রশিক্ষিত সেনার চেয়েও বেশি কিছু—এমন একজন নেতা বা প্রশিক্ষক তৈরি করা, যিনি ফিরে গিয়ে আরও বহু সেনার দক্ষতা বাড়াতে পারবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















