ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক বিপর্যয়কে কেবল একজন ক্ষমতাবান নেতার ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি আড়ালেই থেকে যাবে। ২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক কাঠামোর একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা সামনে আসার পর মাত্র চার দিনের মধ্যে যে তীব্র বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তাতে প্রকল্পটি ভেস্তে যায়। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কেউ কেউ পরিকল্পনা থেকে দূরত্ব তৈরি করেন। ফলে ইনফান্তিনোর নিজের অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
কিন্তু এখানেই ফিফার সমস্যার শেষ নয়। বরং বর্তমান ঘটনাটি দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংকট ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; এর গভীরে রয়েছে এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো, যা বারবার একই ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি এবং জবাবদিহির দুর্বলতা তৈরি করে।
প্রতিশ্রুত স্বচ্ছতার বদলে পুরোনো ছায়া
২০১৬ সালে ফিফার সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ইনফান্তিনো বলেছিলেন, তিনি সংস্থাটির ভাবমূর্তি ও সম্মান ফিরিয়ে আনবেন এবং একটি নতুন, স্বচ্ছ যুগের সূচনা করবেন। কিন্তু এক দশক পর সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব স্পষ্ট।
তাঁর পূর্বসূরি সেপ ব্লাটারের আমলে ফিফা গভীর দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে আক্রান্ত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের অভিযানে ফিফার সাত কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, তার জালিয়াতি ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ওঠে। ইনফান্তিনোর আমলে একই মাত্রার ফৌজদারি কেলেঙ্কারি দেখা যায়নি। তবু নেতৃত্বের ধরন এবং নৈতিকতা ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের ক্ষেত্রে পুরোনো সমস্যাগুলোর অনেকটাই রয়ে গেছে।
সমস্যাটি আরও প্রকট হয় যখন একজন সভাপতি নিজেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির সমার্থক ভাবতে শুরু করেন। বিশ্বকাপের পর ইনফান্তিনোর দীর্ঘ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বার্তায় সমালোচকদের ‘হেটার’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তাঁদের ফুটবল ম্যাচ দেখতে বলার ঘটনাটি সেই মানসিকতার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
অথচ কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে ফুটবল ভালোবাসতে এবং ফিফার সভাপতির সমালোচনা করতে পারেন। বরং অনেক সমালোচকের আপত্তির উৎসই হতে পারে খেলাটির প্রতি গভীর অনুরাগ। এই পার্থক্যটি না বুঝতে পারা নেতৃত্বকে বাস্তব জনমত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
ক্ষমতার চারপাশে তৈরি হয় প্রতিধ্বনির বলয়
ফিফার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সামনে আসে তা হলো, শীর্ষ নেতৃত্বের চারপাশে যখন সমালোচনা ও স্বাধীন নজরদারির জায়গা সংকুচিত হয়, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্বও বাড়তে থাকে।
ভিসা প্রত্যাখ্যান, শৃঙ্খলাবিধির ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক—এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও প্রতিকূল সংবাদ বা সমালোচনাকে সহজভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা দেখা যায়নি।
এই পরিবেশেই ৪.২ বিলিয়ন ডলারের অংশীদারিত্ব বিক্রির মতো একটি পরিকল্পনা গোপনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। বিনিয়োগকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন ট্রাম্পের পারিবারিক ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি। অথচ পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে এলে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, তা সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে বলে মনে হয় না। এমনকি ইনফান্তিনোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাকেও পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করা হয়নি।
এখানেই ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড় হয়ে ওঠে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে যদি ভিন্নমতকে ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয় এবং বাইরের নজরদারিকে অবৈধ হস্তক্ষেপ মনে করা হয়, তাহলে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
কেন বারবার একই ধরনের নেতৃত্ব তৈরি হয়
ফিফার সমস্যাকে বোঝার জন্য জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর কথা মনে পড়তে পারে। নতুন নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষমতার কাঠামো তাকে আগের শাসনেরই অনুরূপ করে তোলে।
ইনফান্তিনোর ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটেনি। তাঁর স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতির এক বছরের মধ্যেই ফিফার নৈতিকতা ও প্রশাসনিক কমিটির প্রধানদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগেই নিরীক্ষা কমিটির প্রধান পদত্যাগ করেছিলেন, কারণ নির্বাহী নেতৃত্ব ফিফা কাউন্সিলকে তথাকথিত স্বাধীন নজরদারি সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা দিয়েছিল।
অর্থাৎ সমস্যার শিকড় ব্যক্তির আচরণে যতটা, তার চেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা-বণ্টনে।
২১১ ভোটের গণতন্ত্র, কিন্তু কাদের জন্য?
ফিফার রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে ‘এক সদস্য, এক ভোট’ নীতি। বিশ্বের ২১১টি সদস্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যেকটির ভোটের মূল্য সমান। কাগজে-কলমে এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ইনফান্তিনোও তাঁর প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব থেকে পাওয়া অর্থ সব সদস্যের মধ্যে সমানভাবে বণ্টনের ধারণাকে ফুটবলের ‘গণতন্ত্রীকরণ’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
ছোট ও তুলনামূলকভাবে অনুন্নত ফুটবল জাতিগুলোর দৃষ্টিতে এই ব্যবস্থা ন্যায্যতার প্রতীক। ইউরোপের লিগগুলোতে আফ্রিকান খেলোয়াড়দের অবদান থাকলেও তাঁদের দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে সেই অর্থের খুব সামান্য অংশ পৌঁছায়—এমন অভিযোগও রয়েছে। এই বৈষম্য বাস্তব এবং তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কিন্তু একই ব্যবস্থা যখন প্রশাসনিক ক্ষমতার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত শক্তির সঙ্গে ভোটের কোনো সম্পর্ক না থাকায় ছোট সদস্যদের সমর্থন সংগঠিত করে ক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
জার্মানির মতো একটি দেশে প্রায় ৮৪ মিলিয়ন মানুষ এবং ২০ লাখের বেশি নিবন্ধিত খেলোয়াড় রয়েছে, অথচ ফিফায় তাদের ভোট একটি। অন্যদিকে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জনসংখ্যার মন্টসেরাটেরও ভোট একটি। রাজনৈতিক সমতার এই ধারণা তাই বাস্তব ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রতিফলিত করে না।
এখানেই অর্থ ও আনুগত্যের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ফিফার প্রধান যদি ছোট অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে অর্থ ও সুবিধা বিতরণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমর্থন শক্তিশালী করতে পারেন, তাহলে সংস্কারের চেয়ে বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো টিকিয়ে রাখার প্রণোদনাই বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।
প্রেসিডেন্ট বদলালেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
ফিফার সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ইনফান্তিনোকে সরিয়ে নতুন কাউকে বসানোই কি যথেষ্ট?
উত্তর হওয়া উচিত—না।
নতুন সভাপতি যদি একই ভোটব্যবস্থা, একই অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কাঠামো এবং একই দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করেন, তাহলে সময়ের সঙ্গে তিনিও একই ধরনের ক্ষমতার রাজনীতিতে আটকে পড়তে পারেন।
সমাধান হিসেবে এক সদস্য এক ভোট পুরোপুরি বাতিল করতেই হবে এমন নয়। রাগবির মতো ওজনভিত্তিক ভোটব্যবস্থাও আলোচনার বিষয় হতে পারে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো সদস্যদের মধ্যে অর্থ বিতরণকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আনুগত্যের হাতিয়ার হওয়া থেকে বিরত রাখা।
এর জন্য দরকার স্পষ্ট, নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য অর্থায়ন সূত্র। একই সঙ্গে ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে নারী ফুটবল, খেলোয়াড়দের সংগঠন এবং ক্লাবগুলোর মতো বর্তমানে তুলনামূলকভাবে কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া পক্ষগুলোকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা যেতে পারে।
বর্তমান সংকট তাই কেবল ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়। এটি ফিফার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। এই মুহূর্তের চাপ যদি কেবল একজন সভাপতিকে সরিয়ে দেওয়ার কাজে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
ফিফার জন্য আসল পরীক্ষা হলো, তারা কি একজন নতুন নেতা খুঁজবে, নাকি এমন একটি নতুন কাঠামো তৈরি করবে যেখানে ভবিষ্যতের কোনো নেতাই প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্যক্তিগত ক্ষমতার এমন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না?
কারণ নেতৃত্ব বদলানো সহজ। যে ব্যবস্থা একই ধরনের নেতৃত্ব তৈরি করে, সেটি বদলানোই আসল সংস্কার।
ম্যাথিউ ব্রুকার 



















