দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলি আল-তাহের পাহাড়ের নিচে থাকা সুড়ঙ্গ থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে ইসরায়েল। শুক্রবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানান, পাহাড়টির নিচের সুড়ঙ্গগুলো এখন ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এবং সেখানে থাকা যোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কৌশলগত পাহাড় ঘিরে তীব্র সংঘাত
নাবাতিয়াহর কাছে অবস্থিত আলি আল-তাহের পাহাড়টি বিস্তীর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান। গত কয়েক মাসে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই পাহাড়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার রাতে জানায়, তারা ওই এলাকার ওপর কার্যকর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের দাবি, পাহাড়ের নিচে তৈরি সুড়ঙ্গগুলোতে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা অবস্থান করছিলেন। অভিযানে কয়েকজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং অন্যরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন বলে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, অভিযান শেষ হয়েছে এবং সুড়ঙ্গগুলো থেকে ‘সন্ত্রাসীদের’ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে হিজবুল্লাহ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। পাশাপাশি পাহাড়টির বর্তমান পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
যুদ্ধবিরতির পরও উত্তেজনা
জুনে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও দক্ষিণ লেবাননের এই অঞ্চলকে ঘিরে উত্তেজনা কমেনি। হিজবুল্লাহ পাহাড়টির নিচে ভূগর্ভস্থ একটি কমান্ড কেন্দ্র ও অস্ত্রের গুদাম তৈরি করেছিল বলে ধারণা করা হয়। সংগঠনটি আগেই জানিয়েছিল, ইসরায়েল সেখানে হামলা চালালে তারা প্রতিরোধ করবে।
গত মার্চে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার পর দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে ইসরায়েল।
এর আগে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত মাসে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিল যে আলি আল-তাহের পাহাড়ে হিজবুল্লাহর অবস্থানে ইসরায়েল হামলা চালালে তেহরান শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
পাঁচ লেবানিজ বন্দিকে মুক্তি
এদিকে ইসরায়েল শুক্রবার পাঁচ লেবানিজ বন্দির মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তাদের মধ্যে চারজনকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মাধ্যমে লেবাননের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর একদিন আগে আরও একজনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান আলোচনায় আস্থা তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে এই মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, মুক্তি পাওয়া পাঁচজনের কারও সঙ্গে সশস্ত্র কোনো সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ স্বজনদের নিয়ে উদ্বেগ
লেবাননে ইসরায়েলি হেফাজতে থাকা নাগরিকদের পক্ষে কাজ করা একটি কমিটির দাবি, গত ছয় মাসে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে কয়েক ডজন মানুষকে আটক করেছে। তাদের কেউ কেউ কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর মুক্তি পেলেও অনেকে এখনো ইসরায়েলি হেফাজতে রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি হেফাজতে থাকা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তাদের দেখা করার সুযোগ হয়নি।
সংস্থাটি বলেছে, লেবাননের বহু পরিবার এখনো তাদের স্বজনদের ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে। আটক, নিহত কিংবা নিখোঁজ—স্বজনদের কী হয়েছে, তা নিয়ে এসব পরিবারের উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা সম্ভবত প্রথম দফার বন্দি। তার এই বক্তব্যে আরও কিছু লেবানিজ বন্দির মুক্তির সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ১৯৮০-এর দশকে লেবাননে নিহত কয়েকজন ইহুদি ব্যক্তির মরদেহের অবশেষও লেবানন ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করবে। তবে কারা হস্তান্তর হবেন বা কবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
দক্ষিণ লেবাননে সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইসরায়েলি দাবি এবং বন্দি বিনিময়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ—দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পরও পরিস্থিতি যে ভঙ্গুর, তা আরও স্পষ্ট করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















