০১:৪২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্ন অনিশ্চিত, রেমিট্যান্সেও চাপ ইরানের ফিফা বিশ্বকাপের টিকেট বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতে ড্রোন হামলায় ৫ বাংলাদেশি আহত, দূতাবাস মাঠে ইরান-ইসরায়েল আবার থামল, কিন্তু শান্তি কতটা টেকসই? ব্যাংক অ্যাকাউন্টে TIN বাধ্যতামূলক হচ্ছে, কোটি গ্রাহকের জীবনে বড় পরিবর্তন টাঙ্গাইলে পিকআপ-ট্রাক সংঘর্ষে ৪ জন নিহত নতুন নির্বাচন কমিশনে প্রাক্তন আমলার নাম, সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার শুনানি ১৬ জুন রামিসা হত্যা: ১৯ দিনে ফাঁসির রায়, দেশজুড়ে স্বস্তি ইসলামী ব্যাংকে সংকট: সাত দিনে উঠে গেল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি লাজুক জুঁই

চিতা-বাঘের শেষ আলোঝলক

  • সারাংশ
  • বাংলাদেশে এখন পূর্ণ বয়স্ক চিতা বাঘের সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০টি
  • বেশিভাগ সাঙ্গু ও মাতামূহুরী এলাকায়
  • ভাওয়ালে কোন চিতাবাঘ এখন আর নেই
  • ৬০ এর দশকেও ঢাকার আশে পাশে চিতা দেখা যেত

ক্যামেরা-ট্র্যাপে নতুন আশার ছবি

চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টসের সাঙ্গু-মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনে জুন ২০২৫-এ বসানো ক্যামেরা-ট্র্যাপে এক পূর্ণবয়স্ক চিতা-বাঘ ধরা পড়েছে। ২০২১-এর পর এটিই প্রথম স্পষ্ট প্রমাণ; সংরক্ষণকর্মীদের আশা জাগিয়েছে সাফল্যটি।

এক শতক আগের বাংলাদেশ: বন মানেই চিতা-বাঘ

ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত প্রায় সব চিরহরিৎ ও শালবন—চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টস, কক্সবাজার-টেকনাফ উপদ্বীপ, সিলেটের লাউয়াছড়া, মধুপুর ও ভাওয়াল—চিতা-বাঘের নিরাপদ আবাস ছিল। ঢাকার উপকণ্ঠেও মাঝেমধ্যে তাদের দেখা মিলত।

ভাওয়াল শাল বন: হারানো অভয়ারণ্যের দলিল

আজকের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান একসময় ‘ভাওয়াল গড়’ নামে বিশাল মধুপুর শালবনের অংশ ছিল। ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত এখানে নিয়মিত চিতা-বাঘের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। এখন ৫ হাজার হেক্টর শালগাছ টিকে থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত শিকার ও বস্তি-বিস্তারে বড় বন্যপ্রাণী কার্যত বিলুপ্ত।

পতনের সূত্রপাত

  • ১৯৬০-এর দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, হিলট্র্যাক্টসে কাঠ-ব্যবসা ও জুম-চাষ শুরু হলে আবাস খণ্ডিত হতে থাকে।
  • স্বাধীনতার পর অবৈধ গাছ-কাটা, পাইন-ইউক্যালিপটাস বাগান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সম্প্রসারণ ও পর্যটন প্রকল্প ভাওয়াল-মধুপুর এলাকায় ৯০ শতাংশের বেশি শালবন নিশ্চিহ্ন করে।
  • সাঙ্গু-মাতামুহুরি ও কাসালাং রিজার্ভ-বনে সড়ক আর কাঠ-পাচার পরিস্থিতিকে আরও ঘোরাল করে তোলে।

বর্তমান চিত্র

আইইউসিএন-এর ২০১৫ ‘রেড লিস্ট’ অনুযায়ী চিতা-বাঘ বাংলাদেশে ‘জীবনসঙ্কটাপন্ন’। সাম্প্রতিক জরিপগুলো ইঙ্গিত দেয়—দেশে মাত্র ৩০-৫০টি পূর্ণবয়স্ক চিতা-বাঘ টিকে আছে, বেশির ভাগই কাসালাং-সাঙ্গু-মাতামুহুরি ও কক্সবাজারের হিমছড়ি-ইনানী এলাকায়। ভাওয়াল ও মধুপুর শালবনে প্রজাতিটি ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত ধরা হয়।

সংকটের মূল কারণ

  • আবাস ধ্বংস: শাল ও পাহাড়ি বন উজাড়; পর্যটন-চাপ
  • খাদ্যের অভাব: হরিণসহ শিকারপ্রাণী দ্রুত কমে যাওয়া
  • শিকার ও পাচার: চামড়া-হাড়ের অবৈধ বাজার, মানুষ-বাঘ সংঘর্ষ
  • নীতিগত দুর্বলতা: বন আইন প্রয়োগে ঘাটতি, গবেষণার অভাব

করণীয়

১. ভাওয়াল-মধুপুর-লাউয়াছড়া থেকে চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টস পর্যন্ত বন করিডর পুনর্গঠন
২. কমিউনিটি-ভিত্তিক টহল ও ক্যামেরা-ট্র্যাপ পর্যবেক্ষণ বাড়ানো
৩. শিকারবিরোধী গণসচেতনতা, বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠসূচিতে অন্তর্ভুক্তি

৪. বনবিভাগে বিশেষ চিতা-বাঘ টাস্কফোর্স ও বৈজ্ঞানিক জরিপ-তহবিল
৫. ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও মধুপুর গড়ে শালবন পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

রাজধানীর পাশের গল্প ছিলো

ভাওয়াল ও মধুপুর একসময় রাজধানীর সন্নিকট ‘বাঘ-বনের’ গল্প শোনাত। আজ সেখানে চিতা-বাঘ নেই, তবু সাঙ্গু-মাতামুহুরি জঙ্গলের ক্যামেরা-ট্র্যাপ-এর ঝকঝকে ছবিটি মনে করায়—সঠিক পরিকল্পনা ও স্থানীয় সহায়তায় বাংলাদেশের মাটিতে এই রাজসিক বন-বিড়াল এখনও বেঁচে থাকতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্ন অনিশ্চিত, রেমিট্যান্সেও চাপ

চিতা-বাঘের শেষ আলোঝলক

০৭:০০:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ জুন ২০২৫
  • সারাংশ
  • বাংলাদেশে এখন পূর্ণ বয়স্ক চিতা বাঘের সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০টি
  • বেশিভাগ সাঙ্গু ও মাতামূহুরী এলাকায়
  • ভাওয়ালে কোন চিতাবাঘ এখন আর নেই
  • ৬০ এর দশকেও ঢাকার আশে পাশে চিতা দেখা যেত

ক্যামেরা-ট্র্যাপে নতুন আশার ছবি

চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টসের সাঙ্গু-মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনে জুন ২০২৫-এ বসানো ক্যামেরা-ট্র্যাপে এক পূর্ণবয়স্ক চিতা-বাঘ ধরা পড়েছে। ২০২১-এর পর এটিই প্রথম স্পষ্ট প্রমাণ; সংরক্ষণকর্মীদের আশা জাগিয়েছে সাফল্যটি।

এক শতক আগের বাংলাদেশ: বন মানেই চিতা-বাঘ

ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত প্রায় সব চিরহরিৎ ও শালবন—চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টস, কক্সবাজার-টেকনাফ উপদ্বীপ, সিলেটের লাউয়াছড়া, মধুপুর ও ভাওয়াল—চিতা-বাঘের নিরাপদ আবাস ছিল। ঢাকার উপকণ্ঠেও মাঝেমধ্যে তাদের দেখা মিলত।

ভাওয়াল শাল বন: হারানো অভয়ারণ্যের দলিল

আজকের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান একসময় ‘ভাওয়াল গড়’ নামে বিশাল মধুপুর শালবনের অংশ ছিল। ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত এখানে নিয়মিত চিতা-বাঘের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। এখন ৫ হাজার হেক্টর শালগাছ টিকে থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত শিকার ও বস্তি-বিস্তারে বড় বন্যপ্রাণী কার্যত বিলুপ্ত।

পতনের সূত্রপাত

  • ১৯৬০-এর দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, হিলট্র্যাক্টসে কাঠ-ব্যবসা ও জুম-চাষ শুরু হলে আবাস খণ্ডিত হতে থাকে।
  • স্বাধীনতার পর অবৈধ গাছ-কাটা, পাইন-ইউক্যালিপটাস বাগান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সম্প্রসারণ ও পর্যটন প্রকল্প ভাওয়াল-মধুপুর এলাকায় ৯০ শতাংশের বেশি শালবন নিশ্চিহ্ন করে।
  • সাঙ্গু-মাতামুহুরি ও কাসালাং রিজার্ভ-বনে সড়ক আর কাঠ-পাচার পরিস্থিতিকে আরও ঘোরাল করে তোলে।

বর্তমান চিত্র

আইইউসিএন-এর ২০১৫ ‘রেড লিস্ট’ অনুযায়ী চিতা-বাঘ বাংলাদেশে ‘জীবনসঙ্কটাপন্ন’। সাম্প্রতিক জরিপগুলো ইঙ্গিত দেয়—দেশে মাত্র ৩০-৫০টি পূর্ণবয়স্ক চিতা-বাঘ টিকে আছে, বেশির ভাগই কাসালাং-সাঙ্গু-মাতামুহুরি ও কক্সবাজারের হিমছড়ি-ইনানী এলাকায়। ভাওয়াল ও মধুপুর শালবনে প্রজাতিটি ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত ধরা হয়।

সংকটের মূল কারণ

  • আবাস ধ্বংস: শাল ও পাহাড়ি বন উজাড়; পর্যটন-চাপ
  • খাদ্যের অভাব: হরিণসহ শিকারপ্রাণী দ্রুত কমে যাওয়া
  • শিকার ও পাচার: চামড়া-হাড়ের অবৈধ বাজার, মানুষ-বাঘ সংঘর্ষ
  • নীতিগত দুর্বলতা: বন আইন প্রয়োগে ঘাটতি, গবেষণার অভাব

করণীয়

১. ভাওয়াল-মধুপুর-লাউয়াছড়া থেকে চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টস পর্যন্ত বন করিডর পুনর্গঠন
২. কমিউনিটি-ভিত্তিক টহল ও ক্যামেরা-ট্র্যাপ পর্যবেক্ষণ বাড়ানো
৩. শিকারবিরোধী গণসচেতনতা, বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠসূচিতে অন্তর্ভুক্তি

৪. বনবিভাগে বিশেষ চিতা-বাঘ টাস্কফোর্স ও বৈজ্ঞানিক জরিপ-তহবিল
৫. ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও মধুপুর গড়ে শালবন পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

রাজধানীর পাশের গল্প ছিলো

ভাওয়াল ও মধুপুর একসময় রাজধানীর সন্নিকট ‘বাঘ-বনের’ গল্প শোনাত। আজ সেখানে চিতা-বাঘ নেই, তবু সাঙ্গু-মাতামুহুরি জঙ্গলের ক্যামেরা-ট্র্যাপ-এর ঝকঝকে ছবিটি মনে করায়—সঠিক পরিকল্পনা ও স্থানীয় সহায়তায় বাংলাদেশের মাটিতে এই রাজসিক বন-বিড়াল এখনও বেঁচে থাকতে পারে।