ঢাকার জমি আজ যেন এক ধরনের ডিমান্ড বাবল (demand bubble)। শুধু অনুভূতি বা সংবেদন নয়, বহু রিপোর্ট ও গবেষণা দেখাচ্ছে যে এখানে এক সময়ে “জমি বিনিয়োগ” প্রায় একটি স্ব-সচল খাত হয়ে উঠেছে। এই অভ্যাসীকরণ এবং অতিমূল্য বৃদ্ধি শুধু বাস্তুতন্ত্র ও সামাজিক সমস্যা নয়, ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।
নিচে প্রথমে কিছু প্রমাণস্বরূপ তথ্য ও ডেটা দেওয়া হলো, তারপর বিশ্লেষণ, প্রভাব এবং নীতি-পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে।
জমি ও আবাসন মূল্যে গড় প্রবণতা
- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে একটি “Residential Property Price Index (RPPI)” তৈরির কাজ শুরু করেছে, যা ঢাকার আবাসনমূল্য পরিবর্তন মাপার প্রক্রিয়া ও রিপোর্ট করার কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
- একটি রিয়েল এস্টেট বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম বলছে, ঢাকার আবাসনমূল্য গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেখেছে। বিশেষ করে নগর এলাকায় জমির সীমিত সরবরাহ, নির্মাণ খরচ বৃদ্ধি ও সাপ্লাই–ডিমান্ড অসামঞ্জস্য এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।
- “Up to land price hike in two decades …” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে The Business Standard। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—গুলশানের এক কাঠা জমির দাম উনিশ শত পঁচাত্তরে ছিল পঁচিশ হাজার টাকা, আর দুই হাজার কুড়িতে তা পৌঁছেছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কাছাকাছি।
- স্থানীয় সংবাদসূত্র অনুযায়ী, দুই হাজার একুশ সালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমির দাম ছিল:
- বারিধারা আবাসিক এলাকায় প্রতি কাঠা প্রায় সাত কোটি পঁচাত্তর লাখ টাকা
- গুলশান ~ ছয় কোটি পঁচিশ লাখ টাকা
- ধানমন্ডি ~ পাঁচ কোটি পঞ্চাশ লাখ টাকা
- বনানী ~ চার কোটি টাকা
- লালমাটিয়া ~ সাড়ে তিন কোটি টাকা
- মহাখালি, কারওয়ানবাজার, মতিঝিলেও দাম কোটি টাকার বেশি ছিল
- পূর্বাচলে পাঁচ কাঠা প্লট বিক্রি হয়েছে প্রায় ষাট লাখ টাকায় (প্রতি কাঠা ~ বারো লাখ)।
- বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট ও বাজার বিশ্লেষণ বলছে, দুই হাজার পঁচিশ সালে রিয়েল এস্টেট খাতে বাংলাদেশে আট থেকে দশ শতাংশ বা তার বেশি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
- একটি রিয়েল এস্টেট শিল্প রিপোর্ট (দুই হাজার তেইশ) বলছে, বাংলাদেশে আবাসন ও খালি জমি বাজার এখন “খুব সক্রিয়” এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে ডেটার অভাব এখনও একটি বড় সীমাবদ্ধতা।

বিশ্লেষণ: কেন দাম এমনভাবে বেড়েছে?
সাপ্লাই ও জমির সীমাবদ্ধতা
- ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকায় নতুন জমি পাওয়া কঠিন। নদী, খাল, সংরক্ষিত অঞ্চল ও বন্যা প্রবাহপথ অনেক জমিকে ব্যবহারযোগ্য হতে দেয় না।
- রাজউকের বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা (DAP) অনুযায়ী ঢাকার উন্নয়ন এলাকা সম্প্রসারণ করা হয়েছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় অঞ্চলে জমি সীমিত রাখা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনায় ঘাটতি ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতা
- অনেক জমি অননুমোদিতভাবে দখল হয়েছে বা অবৈধ নির্মাণ হয়েছে।
- অবকাঠামোগত পরিকল্পনা (DAP, zoning) সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
- FAR (Floor Area Ratio) নিয়ম সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হলেও অনেক ক্ষেত্রে শিথিল বা ভুল প্রয়োগ হয়েছে।
নির্মাণ খরচ ও উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি
- সিমেন্ট, লোহা, ইট ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়েছে, যা ফ্ল্যাট ও ভবন নির্মাণ খরচ বাড়িয়েছে।
- নির্মাণ ব্যয়ের প্রভাব সরাসরি জমি ও ফ্ল্যাট বিক্রয়মূল্যে পড়েছে।
বিনিয়োগমূলক চাহিদা ও প্রবাসী অর্থ
- জমি ও ফ্ল্যাটকে অনেকেই নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করেন এবং ব্যবহার না করেও জমি ধরে রাখেন।
- প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও ঢাকার রিয়েল এস্টেটে প্রবাহিত হচ্ছে, যা চাহিদাকে আরও বাড়াচ্ছে।
প্রধান নগরকেন্দ্রিকরণ ও অর্থনৈতিক আকর্ষণ
- ঢাকা দেশের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বড় কোম্পানি, সরকারি অফিস ও সেবা খাত এখানে কেন্দ্রীভূত।
- চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য মানুষ ঢাকায় আসছে, ফলে জমির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।

প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ
- বাসযোগ্যতার সংকট ও ভাড়া বৃদ্ধি
যারা জমি কিনতে পারছে না, তারা ভাড়ায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে। ভাড়া বৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। - আর্থিক অসমতা ও ভেদাভেদ বৃদ্ধি
ধনীদের হাতে জমি ও ফ্ল্যাট কেন্দ্রিক সম্পদ জমা হচ্ছে, আর গরিব ও মধ্যবিত্তদের অংশ সংকীর্ণ হচ্ছে। - অবকাঠামোর চাপ ও নগর সমস্যা
ড্রেনেজ, পানি সঙ্কট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট—সব সমস্যাই তীব্র হচ্ছে। - শিল্প ও উৎপাদন খাতের ক্ষতি
বিপুল অর্থ রিয়েল এস্টেটে আটকে থাকলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ কমে যায়। কর্মসংস্থান ও অগ্রগতির সুযোগও হ্রাস পায়। - বিনিয়োগের ঝুঁকি ও “ঝামেলাপূর্ণ জমি”
অনেক জমি আইনগতভাবে পরিষ্কার নয়—দখল, মালিকানা বিরোধ ও পরিকল্পনাজনিত জটিলতা থেকে ঝুঁকি বাড়ছে।
নীতিগত ও বাস্তব পরামর্শ
DAP ও নগর পরিকল্পনা শক্তিশালী করা
- রাজউকের বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
- নতুন স্যাটেলাইট শহর ও ছোট শহরের অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি, যাতে ঢাকার ওপর চাপ কমে।
- জমির zoning (আবাসিক, বাণিজ্যিক, মিশ্র ব্যবহার) স্পষ্টভাবে নির্ধারণ ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
খালি বা অব্যবহৃত জমির ওপর কর ও প্রণোদনা
- জমি কিনে ফেলে রাখা মালিকদের ওপর কর আরোপ করা যেতে পারে।
- বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য কর ছাড় দেওয়া যেতে পারে, যদি সেখানে আবাসন প্রকল্প চালু হয়।
সহজলভ্য মধ্যআয় হাউজিং প্রকল্প
- সরকার ও ব্যাংকগুলো কম সুদে গৃহঋণ চালু করতে পারে।
- আবাসন প্রকল্পগুলোর নির্দিষ্ট অংশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের জন্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
স্বচ্ছতা, ভূমি সংস্কার ও রেকর্ড ডিজিটালীকরণ
- জমির খতিয়ান, সহভাগ ও সীমানা রেকর্ড ডিজিটালি সংরক্ষণ ও হালনাগাদ করতে হবে।
- দখল-মালিকানা বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালত বা নজরদারি কাঠামো প্রয়োজন।

নিরাপদ বিনিয়োগ ও রিয়েল এস্টেট আইন প্রয়োগ
- রাজউক অনুমোদিত প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত, যাতে আইনগত জটিলতা কমে।
নগর পরিবহন ও অবকাঠামো উন্নয়ন
- মেট্রো, এক্সপ্রেসওয়ে ও সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন করে দূরবর্তী এলাকা বাসযোগ্য করা জরুরি।
ভাড়ানীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা
- নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, সহায়তা বা ভাতা-ভিত্তিক আবাসন প্রকল্প চালু করা যেতে পারে।
- সামাজিক আবাসন নীতি প্রণয়ন করে সাধারণ মানুষের ফ্ল্যাট বা জমি কেনা সহজ করা প্রয়োজন।
ঢাকার জমি মূল্যবৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক প্রবণতা নয়; এটি গড়ে উঠেছে সামাজিক, নীতিগত, পরিকল্পনাগত ও বাজার-চাহিদার জটিল সমন্বয়ে। ডেটা স্পষ্টভাবে বলছে—উনিশ শত সত্তর দশক থেকে আজ পর্যন্ত জমির দাম শতগুণ বেড়েছে এবং এখনও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি উপযুক্ত নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ না করা হয়, তবে ঢাকা ধনী ও প্রভাবশালীদের শহরে পরিণত হবে, আর সাধারণ মানুষের জন্য রয়ে যাবে অলীক স্বপ্ন।
তবে সম্ভাবনাও আছে—সরকার ও নীতিনির্ধারকরা যদি পরিকল্পিত নগর বিভাজন, সাশ্রয়ী আবাসন, বিনিয়োগ-উৎসাহ ও স্বচ্ছ ভূমি আইন নিশ্চিত করতে পারেন, তবে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ, কার্যকর ও মানবকেন্দ্রিক নগর ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















