বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, আর নদীই এই দেশের প্রাণ। নদীর পলি জমে গঠিত অসংখ্য দ্বীপ বা চর বাংলাদেশের ভূগোল ও সংস্কৃতিকে দিয়েছে বৈচিত্র্যময় রূপ। এসব দ্বীপের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ভোলা দ্বীপ। আয়তনে প্রায় ৩,৪০৩ বর্গকিলোমিটার, ভোলা একদিকে যেমন কৃষি ও মৎস্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদেও ভোলার রয়েছে বিশেষ অবস্থান। এ দ্বীপকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সাতটি উপজেলা, লক্ষাধিক মানুষের জীবনযাত্রা, নানান সম্ভাবনা এবং অগণিত চ্যালেঞ্জ।
ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক গঠন
ভোলা মূলত পদ্মা, মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর পলি জমে তৈরি হওয়া একটি ডেল্টিক দ্বীপ। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, চারদিকে নদ-নদী আর মাঝখানে উর্বর পলিমাটি—এমন এক পরিবেশে ভোলা বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য ভূখণ্ড। তবে ভোলার সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে ঝুঁকি। প্রতিবছর ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসে এখানে বসতি, জমি, রাস্তা-ঘাট হারিয়ে যায়। স্থানীয় কৃষক আব্দুল কাদের বললেন, “প্রতি বছরই আমাদের ভাঙনের ভয় নিয়ে ঘুমাতে হয়। সকালে উঠে দেখি বাড়ির পাশে নদী, আর কয়েক মাস পর হয়তো ওই বাড়িই থাকবে না।”
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
ভোলা দ্বীপের ইতিহাস প্রাচীন। এ অঞ্চল মুঘল যুগ থেকে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। নদীপথের কারণে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ব্রিটিশ আমলে ভোলা নদীবন্দর হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সেসময় থেকে এখানকার কৃষিপণ্য ও মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। পাকিস্তান আমলে কিছুটা অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ভোলাকে চিরস্মরণীয় করে তোলে। তখন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মারা যায়, যা আজও স্থানীয়দের স্মৃতিতে দগদগে ঘা। মনপুরার প্রবীণ বাসিন্দা ফজলু মিয়া বলেন, “আমার চোখের সামনে গ্রামের মানুষ নদীতে ভেসে গিয়েছিল। সেই রাতের চিৎকার আজও কানে বাজে।”
প্রশাসনিক কাঠামো
১৯৮৪ সালে ভোলা জেলা হিসেবে গঠিত হয়। জেলার মোট সাতটি উপজেলা হলো—ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমুদ্দিন, চরফ্যাশন, মনপুরা এবং লালমোহন। প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। কোথাও শক্তি কৃষি, কোথাও মাছ ধরা, আবার কোথাও বৈশিষ্ট্য সাংস্কৃতিক বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।

ভোলা সদর উপজেলা
ভোলা সদর জেলা প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও বাজারকেন্দ্রের জন্য বিখ্যাত। এখানে অবস্থিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আদালত ও বেশ কিছু কলেজ। নদীপথে সদর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজে যাতায়াত করা যায়। এখানকার মানুষ মূলত ব্যবসা, চাকরি, কৃষি ও মৎস্যের সঙ্গে জড়িত। ভোলা শহরের বাসিন্দা নাজমা আক্তার বললেন, “আমাদের শহরে এখন দোকানপাট আর বাজার বেড়েছে, মেয়েদেরও পড়াশোনার সুযোগ আছে। তবে নদীভাঙনের ভয় আমরা সবাই বুকে নিয়ে চলি।”
দৌলতখান উপজেলা
মেঘনার তীরবর্তী দৌলতখান মূলত ইলিশ মাছের জন্য বিখ্যাত। এখানকার অধিকাংশ মানুষ মৎস্য শিকারে জড়িত। কৃষিও রয়েছে, তবে নদীভাঙনের কারণে জমি হারানোর প্রবণতা বেশি। প্রতি বছর বহু পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র বা নতুন চর এলাকায় বসতি গড়ে। স্থানীয় জেলে রবিউল বললেন, “মেঘনা আমাদের জীবন দেয় আবার নিয়ে যায়ও। ইলিশের মৌসুমে আয় ভালো হয়, কিন্তু ভাঙনে ঘরবাড়ি সব শেষ হয়ে যায়।”
বোরহানউদ্দিন উপজেলা
বোরহানউদ্দিন উপজেলা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে সমৃদ্ধ। এখানে প্রাচীন মসজিদ, মাজার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা এখানকার মূলভিত্তি। বাজারকে ঘিরে মানুষের জীবন বেশ সক্রিয়। এখানকার শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন বললেন, “আমরা চাই শিক্ষা বিস্তার হোক। এখন অনেক ছেলে-মেয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় যায়, তবে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব আমাদের পিছিয়ে দেয়।”

তজুমুদ্দিন উপজেলা
তজুমুদ্দিন ভৌগোলিকভাবে ছোট হলেও নদীভাঙনের দিক থেকে ভয়াবহ। প্রতি বছর এখানে গ্রাম হারিয়ে যায়, আবার নতুন চর জেগে ওঠে। মানুষ এসব চরে বসতি স্থাপন করে। চরের মানুষ কৃষি করে, বিশেষ করে ডাল ও তিল উৎপাদন করে। তবে অবকাঠামো উন্নয়নের ঘাটতি এখানকার বড় সমস্যা। চরবাসী সেলিনা বেগম বলেন, “আমরা নতুন চরে থাকি, তবে স্কুল আর হাসপাতাল অনেক দূরে। বাচ্চাদের পড়ানো আর অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া খুব কঠিন।”
চরফ্যাশন উপজেলা
চরফ্যাশন ভোলার সবচেয়ে বড় ও জনবহুল উপজেলা। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য একে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কুকরি মুকরি ম্যানগ্রোভ বন এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন চরফ্যাশনের মানুষের প্রধান জীবিকা। এখানকার এক তরুণ উদ্যোক্তা রাশেদ বললেন, “চরে আমরা মাছ চাষ করি, হাঁস-মুরগি পালন করি। যদি ভালো রাস্তা আর বিদ্যুৎ পাই, তাহলে আরও বড় ব্যবসা করা যাবে।”
মনপুরা উপজেলা
মনপুরা বিচ্ছিন্ন হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মনপুরা’ চলচ্চিত্র এ দ্বীপকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে। মনপুরা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এখানকার মানুষ সাহসী ও পরিশ্রমী। স্থানীয় জেলে হানিফ বললেন, “সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই আমাদের বাঁচতে হয়। তবে এখানে সূর্যাস্ত দেখলে সব কষ্ট ভুলে যাই।”
![]()
লালমোহন উপজেলা
লালমোহন কৃষিক্ষেত্রে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। ধান, ডাল, মুগ, তরমুজ এবং বিভিন্ন সবজি উৎপাদনে লালমোহনের অবদান অনেক। এখানে বাজারগুলো কৃষিপণ্যের জন্য ব্যস্ত থাকে। শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও লালমোহনের তরুণরা এগিয়ে এসেছে। স্থানীয় কলেজের ছাত্রী শিলা আক্তার বললেন, “আমরা চাই আমাদের উপজেলায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় হোক। তাহলে মেয়েরা সহজে পড়াশোনা করতে পারবে।”
অর্থনীতি ও জীবিকা
ভোলার অর্থনীতি মূলত কৃষি, মৎস্য ও পশুপালনের উপর নির্ভরশীল। ইলিশ মাছ ধরা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের বড় অংশ ভোলার নদী ও সাগর থেকে আসে। কৃষিক্ষেত্রে ধান, তিল, মুগডাল ও তরমুজ গুরুত্বপূর্ণ। পশুপালনও গ্রামের অর্থনীতিকে সচল রাখে। এছাড়া ভোলার গ্যাসক্ষেত্র জাতীয় জ্বালানি খাতে ভূমিকা রাখছে।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য
ভোলার সংস্কৃতি নদী ও প্রকৃতিনির্ভর। এখানে ভাটিয়ালি, সারি ও বাউল গান প্রচলিত। ঈদ, পূজা, মহরম ও বৈশাখ মেলা মানুষ সমান উৎসাহে পালন করে। নাটক ও কবিতাচর্চাও এখানে জনপ্রিয়। স্থানীয় শিল্পী রুবেল বললেন, “আমরা নদীর গান গাই। নদীর স্রোত আমাদের কণ্ঠে বাজে। এই গানই আমাদের জীবন।”
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
ভোলা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা। নদীভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ গৃহহারা হয়। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ভোলাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। গবেষকরা মনে করেন, যদি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে ভোলার বড় অংশ পানির নিচে চলে যেতে পারে।
পর্যটন সম্ভাবনা
ভোলায় রয়েছে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা। চর কুকরি মুকরির ম্যানগ্রোভ বন ও পাখির ঝাঁক প্রকৃতি প্রেমিকদের টানে। মনপুরার সৌন্দর্য, চরফ্যাশনের জীববৈচিত্র্য ও নদীপথের মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। পর্যটক নাসরিন জাহান বললেন, “মনপুরার সূর্যাস্ত আমি ভুলতে পারি না। যদি এখানে পর্যটন অবকাঠামো তৈরি হয়, তাহলে বিদেশিরাও আসবে।”
উন্নয়ন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ভোলার উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। অবকাঠামো উন্নয়ন, নদীভাঙন প্রতিরোধ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রসার এবং গ্যাস সম্পদের ব্যবহার ভোলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ভোলা যদি আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে এটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
ভোলা দ্বীপ বাংলাদেশের ভূগোল, ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা সত্ত্বেও এখানকার মানুষ তাদের পরিশ্রম, সাহস ও জীবনীশক্তি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে ভোলা শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















