লিড:
বিশ্ববাজারে উৎপাদন খরচ, শুল্কনীতি ও সরবরাহ সংকটের জটিলতায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল (P&G) বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে। দীর্ঘ ৩০ বছরের ব্যবসায়িক উপস্থিতির পর এ সিদ্ধান্ত দেশীয় বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিন দশকের ব্যবসায়িক যাত্রার অবসান
প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করে। প্রাণ গ্রুপের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে তারা স্থানীয় উৎপাদন কার্যক্রম চালায়। এই সময়ে কোম্পানিটি জিলেট, ওরাল-বি, প্যাম্পার্স, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, প্যান্টিন, অ্যারিয়েল, টাইড, মি. ক্লিন, ভিক্সসহ বহু জনপ্রিয় পণ্য সরবরাহ করেছে।
তবে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় পরিবেশক ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ডস লিমিটেড (IBL)-এর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি প্রাণ গ্রুপের সঙ্গে থাকা উৎপাদন চুক্তিও বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে P&G। ফলে বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

গ্লোবাল পুনর্গঠন ও খরচ নিয়ন্ত্রণের অংশ
P&G বিশ্বব্যাপী একটি পুনর্বিন্যাস পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে কোম্পানিটি ২০২৫ সাল থেকে দুই বছরে ৭,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি কিছু এশীয় বাজারে, বিশেষত নারীদের পরিচর্যা পণ্য বিভাগের পুনর্গঠন করছে তারা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও বাজারে মুনাফা হ্রাসের কারণে P&G তাদের উচ্চ খরচের বাজারগুলো থেকে সরে আসছে। ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে সরাসরি ব্যবসা বন্ধ করে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাজারে নানা চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে বিদেশি কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, করনীতি, আমদানি শুল্ক ও অস্থির বাজার পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। কোভিড-পরবর্তী সময়েও বাজার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা “অসম প্রতিযোগিতার” অভিযোগ তুলছেন।
এক অর্থনীতিবিদ বলেন, “যদিও অনেকে মনে করেন এসব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বিপুল মুনাফা করছে, বাস্তবে প্রশাসনিক ও কর-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রত্যাশিত রিটার্ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”

বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য প্রভাব
সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়
চুক্তি বাতিলের ফলে বাজারে P&G পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। ইতোমধ্যে অনেক সুপারশপে তাদের পণ্য অপ্রতুল হয়ে পড়েছে, ফলে বিক্রেতারা বিকল্প ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকছেন।
কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা
প্রাণ গ্রুপের সঙ্গে থাকা উৎপাদন চুক্তি বন্ধ হলে সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিক ও প্রযুক্তিগত কর্মীদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।
বিনিয়োগে নেতিবাচক বার্তা
এ ধরনের বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সরে যাওয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক সঙ্কেত হতে পারে। এতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) প্রবাহ কমার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
স্থানীয় ব্র্যান্ডের সুযোগ
P&G-এর সরে যাওয়া স্থানীয় কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো এই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসতে পারে, যা স্থানীয় শিল্পের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
ভোক্তা ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা
পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্রাহকরা বিকল্প ব্র্যান্ডে যেতে বাধ্য হতে পারেন। এতে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভবিষ্যৎ দিক ও করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, P&G-এর সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ প্রত্যাহার নাও হতে পারে। কোম্পানিটি ভবিষ্যতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশে সীমিতভাবে পণ্য সরবরাহ চালিয়ে যেতে পারে।
তবে সরকারের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। দ্রুত বিনিয়োগবান্ধব নীতি গঠন, কর ও শুল্ক কাঠামো সহজীকরণ এবং বিদেশি কোম্পানির জন্য আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যৌথ উৎপাদন ও বিতরণ চুক্তি বাড়ানো জরুরি।
প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের প্রস্থান শুধু একটি কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের একটি বার্তাও বটে। যদি দ্রুত নীতি-সংস্কার ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা না আনা যায়, তবে আরও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারে।
#P&G #ব্যবসা_বন্ধ #বাংলাদেশ_অর্থনীতি #বিনিয়োগ #FMCG #সারাক্ষণরিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















