চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল বা সিএইচটি (Chittagong Hill Tracts)-তে সাম্প্রতিক সময়ে আদিবাসী নারীর ওপর সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়—বরং এটি দীর্ঘদিনের দমননীতি, দণ্ডমুক্তি ও ভূমি দখলকেন্দ্রিক সংঘাতের ধারাবাহিকতা।
চট্টগ্রাম পাহাড়ি এলাকায় সহিংসতার নতুন ঢেউ
চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর ধারাবাহিক সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের অংশগ্রহণে এই সহিংসতা সংঘটিত হচ্ছে, যা বহু বছর ধরে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক দমননীতি ও দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতিরই সম্প্রসারণ।
সহিংসতার সাম্প্রতিক চিত্র
শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর (৫ আগস্ট ২০২৪) থেকে এখন পর্যন্ত সিএইচটি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৮টি ধর্ষণ, ৭টি ধর্ষণের চেষ্টা, ৪টি যৌন হয়রানি এবং ১টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

সর্বশেষ ঘটনায়, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে খাগড়াছড়িতে ১২ বছরের এক জুম্মা স্কুলছাত্রীকে তিনজন বাঙালি পুরুষ দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এর প্রতিবাদে ২৫ সেপ্টেম্বর শান্তিপূর্ণ মিছিলের আয়োজন করে স্থানীয় জুম্মা ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো। কিন্তু ২৬ সেপ্টেম্বর ওই সমাবেশে বাধা দেয়। একই দিনে বাঙালি বসতি স্থাপনকারীরা জুম্মা জনগণের ওপর হামলা চালায়। এতে বহু মানুষ আহত হন, অন্তত দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
রামসু বাজারে গুলি ও অগ্নিসংযোগ
২৮ সেপ্টেম্বর রামসু বাজার এলাকায় আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালি বসতি স্থাপনকারীরা জুম্মা জনগণের ওপর আক্রমণ করে, দোকানপাট ও ঘরে আগুন দেয়। প্রতিবাদকারীদের প্রতিহত করতে গুলি চালায়, যাতে অন্তত তিনজন জুম্মা নিহত হন এবং অনেকে আহত হন।
অধিকাংশ দোকান ও বাড়িঘর পুড়ে যায়।
দমননীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন নীতি ও প্রশাসনিক দমন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে ক্রমাগত সংকুচিত করেছে। নারীর ওপর যৌন সহিংসতাকে ভয় প্রদর্শনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব সহিংসতা বিচ্ছিন্ন নয়—বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতির অংশ, যার উদ্দেশ্য ভূমি দখল, সাংস্কৃতিক বিনাশ এবং আদিবাসী কণ্ঠকে স্তব্ধ করা।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি
বিবৃতিতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিম্নোক্ত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে—
২৩ সেপ্টেম্বরের ধর্ষণ ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
১৯৫৬ সালের কমিশন অব ইনকোয়ারি আইনের অধীনে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে, যাতে বেসামরিক আদালতের মতো তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষমতা থাকে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা (OHCHR) ও বিশেষ প্রতিনিধি দলকে সিএইচটি-তে প্রবেশ ও তদন্তের সুযোগ দিতে হবে।
আদিবাসী ও বাঙালি উভয়ের অংশগ্রহণে জাতিগত ভারসাম্যপূর্ণ পুলিশ বাহিনী গঠন করতে হবে, ।
মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী বসতি স্থাপনকারীদের স্বেচ্ছায় পুনর্বাসন বা স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান
জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়কে (OHCHR) স্বাধীন তদন্ত কাঠামো গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার সুষ্ঠু তদন্ত হয়।

চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান সহিংসতা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন, বিচারহীনতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা -পাহাড়ে ভয় ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। জরুরি ভিত্তিতে মানবিক ও আইনি পদক্ষেপ না নিলে সহিংসতার এই চক্র আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
#সিএইচটি #CHT #চট্টগ্রাম_হিল_ট্র্যাক্টস #নারী_নির্যাতন #সহিংসতা #মানবাধিকার #আদিবাসী_সংকট #পার্বত্য_চট্টগ্রাম #OHCHR #সারাক্ষণ_রিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















