অরবানের সাম্প্রতিক মস্কো সফর ইউরোপীয় কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর থেকে তিনি বহুবার পুতিনের সঙ্গে দেখা করেছেন, যা তার ন্যাটো ও ইইউ অংশীদারদের ক্ষুব্ধ করে তুলছে। এবারও কোনো ইউরোপীয় ম্যান্ডেট ছাড়াই তিনি পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে যান, যখন রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনা সামনে রেখে মস্কো নতুন রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হাঙ্গেরি–রাশিয়া সম্পর্ক ও জ্বালানি স্বার্থ
পুতিন বৈঠকের শুরুতেই অরবানের ইউক্রেন সংকট নিয়ে তথাকথিত “ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান” প্রশংসা করেন। হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তারা মস্কো থেকে যা চেয়েছেন তা-ই পেয়েছেন—রুশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং পাক্স পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার। হাঙ্গেরি তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বহুদিন ধরেই চাপের মুখে রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৭ সালের মধ্যে রাশিয়ান জ্বালানি আমদানি বন্ধ করতে চাইলেও অরবান ধারাবাহিকভাবে এর বিরোধিতা করে আসছেন। রাশিয়া থেকে হাঙ্গেরি এখনো তার তেল-গ্যাসের বড় অংশ এবং ১০০ শতাংশ পারমাণবিক জ্বালানি পায়, যা রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য আয় যোগ করে।

কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও শান্তি আলোচনার প্রস্তাব
পুতিন জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প বুদাপেস্টকে সম্ভাব্য রাশিয়া–যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের ভেন্যু হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন। অরবানও বলেন, হাঙ্গেরি শান্তি আলোচনার জন্য প্ল্যাটফর্ম দিতে প্রস্তুত। যদিও বৈঠকের আনুষ্ঠানিক অংশে দুই পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট শীতলতা দেখা গেছে এবং এমনকি একটি মুহূর্তে অরবান অসাবধানতাবশত পুতিনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বিব্রত অবস্থায় পড়েন। গত মাসে প্রস্তাবিত বুদাপেস্ট শান্তি সম্মেলন রাশিয়ার কঠোর অবস্থানের কারণে বাতিল হয়েছিল। তবুও অরবান আবারও আলোচনার মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন, যা ইউরোপীয় নেতাদের কাছে সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে।
ইইউর সঙ্গে বিরোধ ও অরবানের রাজনৈতিক বাস্তবতা
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ অরবানের সফরকে ‘ইউরোপীয় স্বার্থবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেছেন। ইউরোপীয় কমিশন প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েনকে পাঠানো চিঠিতে অরবান দাবি করেছেন যে অবিলম্বে এবং শর্তহীনভাবে শান্তি আলোচনা শুরু করতে হবে; ইইউকে সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে; ইউক্রেনকে অতিরিক্ত তহবিল দেওয়া উচিত নয় এবং রাশিয়ার জব্দকৃত সম্পদ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করা যাবে না। এই অবস্থান যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা বা ইউরোপীয় ঐক্য—কোনোটির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে বিশ্লেষকদের মত।

অরবানের অভ্যন্তরীণ চাপ ও আন্তর্জাতিক হিসাব
এপ্রিল মাসের নির্বাচনের আগে অরবান গভীর রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। দীর্ঘ ১৫ বছর পর প্রথমবারের মতো তার দল ফিদেজ পরাজয়ের ঝুঁকিতে। এমন অবস্থায় ট্রাম্প–পুতিন বৈঠক বুদাপেস্টে আয়োজন করতে পারলে তা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। অন্যদিকে, তিনি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তরল গ্যাস এবং পারমাণবিক জ্বালানি কেনার চুক্তি করেছেন, যা রাশিয়াকে বিরক্ত করার সম্ভাবনা থাকলেও তিনি যুক্তি দিচ্ছেন যে এসব চুক্তি ছাড়া হাঙ্গেরিতে জ্বালানির দাম তিনগুণ বেড়ে যেত।
রাশিয়ার লক্ষ্য ও ইউরোপের উদ্বেগ
পুতিন বারবার জানিয়েছেন যে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড রাশিয়াকে দিতে হবে—এমন দাবিতে তিনি অনড়। তাই আপসের কোনো সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। তিনি অরবানকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করেন এবং ইউরোপে ‘জাতীয় স্বার্থভিত্তিক শক্তিগুলোর উত্থান’কে স্বাগত জানান। রাশিয়ার জন্য অরবান এমন এক ইউরোপীয় নেতা যিনি মস্কোর অবস্থানকে বৈধতা দিতে সাহায্য করেন এবং ইউরোপের ভেতর বিভক্তি বাড়ান।
অরবানের মস্কো সফর আবারও দেখিয়ে দিল যে তিনি ইউরোপীয় ঐকমত্য থেকে সরে এসে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—দু’পক্ষের সঙ্গেই নিজস্ব স্বার্থে কূটনৈতিক খেলা খেলতে চাইছেন। জ্বালানি নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এই তিন কারণেই তিনি পুতিনের দিকেই ঝুঁকে আছেন। তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে এবং ইউরোপীয় মঞ্চে তার অবস্থান আরও দুর্বল করবে কিনা—তা সময়ই বলে দেবে।
#হাঙ্গেরি #রাশিয়া #ভিক্টর অরবান # ভ্লাদিমির পুতিন| #ইউক্রেন যুদ্ধ #ইউরোপীয় ইউনিয়ন #ডোনাল্ড ট্রাম্প
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















