যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ইউক্রেনের জন্য ক্ষতিকর শর্তসমৃদ্ধ প্রস্তাব আপাতত ঠেকানো গেছে। তবে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে।
ইউক্রেনের প্রতি কূটনৈতিক হুমকি কি আপাতত কাটল? দেখা যাচ্ছে—অন্তত এখনই তেমনটাই। ২৮ দফা আত্মসমর্পণ–সদৃশ পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার এক সপ্তাহ পর আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সিনেট রিপাবলিকান নেতা এবং ইউরোপীয় দেশগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পেরেছে। তারা আলোচনায় ইউক্রেনকে রক্ষার চেষ্টা করছে। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পরিবেশ—যা অনিশ্চয়তায় ভরা—তার মধ্যে সব ক্ষতিকর শর্ত পুরোপুরি ঠেকানো যাবে কি না, তা কেউই নিশ্চিত নয়।
তবুও ইউক্রেন ও ইউরোপের সামনে কঠিন বাস্তবতা আরও গভীর হচ্ছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিপদ: শান্তির নামে নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি
এই পরিকল্পনাটি ‘শান্তি’ আনার কথা বললেও বাস্তবে তা ভবিষ্যৎ যুদ্ধে পরিণত হওয়ার ভিত্তি তৈরি করছিল। কারণ—
– ইউক্রেনের আত্মরক্ষার সক্ষমতা কমে যেত
– ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসন কার্যত পুরস্কৃত হতো
– রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে তাদের পুনরায় অস্ত্রে সজ্জিত হতে সুযোগ দিত
পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, রাশিয়া ভবিষ্যতে আবার আক্রমণ করলে “সমন্বিত সামরিক জবাব” দেওয়া হবে—কিন্তু কীভাবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্টতা ছিল না। আর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টই পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন নিয়ে সরাসরি সংঘাতে জড়াবেন—এমনটা বাস্তবসম্মত নয়।
দাবি-দাওয়ায় নতুন অগ্রগতি
আলোচনা এখনো চলছে। আশার খবর হলো—আমেরিকা ‘থ্যাঙ্কসগিভিং’-এর মতো কঠোর সময়সীমা শিথিল করেছে। এমনকি হুমকিও পিছিয়েছে যে—চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলে ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য বা অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করা হবে।
জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় মিত্ররাও কিছু ছাড় আদায় করতে পেরেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের চুক্তি হবে—তা এখনো অস্পষ্ট। ইউক্রেনের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার মতো কোনো প্রস্তাব উঠলেই রাশিয়া আপত্তি জানাবে। আর আমেরিকার চাপ সত্ত্বেও যদি উভয় পক্ষ গ্রহণযোগ্য সমাধান না আসে, তাহলে যুদ্ধ চলতেই থাকবে।
যুদ্ধের শেষ কোথায়? তিনটি বড় ঝুঁকিতে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ
ইউক্রেনের সাফল্য মানে একটি সমৃদ্ধ, পশ্চিমমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু তিন দিক থেকেই সেই লক্ষ্য এখন ঝুঁকিতে—
সমৃদ্ধি:
রাশিয়া আবার আক্রমণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলে বিনিয়োগ ও মানুষ দেশ ছেড়ে যাবে।
পশ্চিমমুখী সংযুক্তি:
ইউরোপের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়া জরুরি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি অযৌক্তিক শান্তিচুক্তি চাপিয়ে দেয় এবং ইউরোপ ইউক্রেনকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়—তাহলে ইউক্রেনীয়দের বিশ্বাস ভেঙে পড়বে।
গণতন্ত্র:
দেশ পরিচালনায় রাজনীতিবিদদের নেতৃত্ব জরুরি। কিন্তু ২৮ দফা পরিকল্পনার ফাঁস এসেছে এমন সময়ে—যখন জেলেনস্কির প্রশাসন বড় দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে কেঁপে উঠেছে এবং সরকার ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে, কিন্তু পরাজয় নিশ্চিত নয়
ট্রাম্পপন্থী কিছু ব্যক্তি দাবি করছে—ইউক্রেনের পরাজয় অনিবার্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এ ধরনের দাবি বরং ইউক্রেনের অবস্থানকে দুর্বল করে।
– পুতিন প্রতি মিটার ভূমির জন্য বিশাল মূল্য দিচ্ছেন
– রাশিয়ার অর্থনীতি যুদ্ধে টিকে থাকলেও চাপ বাড়ছে
– তেলের দাম আগামী বছরগুলোতে ৫০ ডলারের ঘরে, আর ২০২৭ সালের দিকে ৩০ ডলারের ঘরে নেমে আসতে পারে বলে অনুমান
রুশ জনগণও যুদ্ধ নিয়ে খুব উদ্বেল নয়। প্রশ্ন হলো—এত কষ্ট সহ্য করতে করতে তারা কবে বুঝবে যে এই যুদ্ধ তাদের জীবন ও সম্পদের অপচয়?
ইউক্রেনের সংকট: জনবল ও অস্ত্রের অভাব
এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা—ইউক্রেনের পর্যাপ্ত জনবল ও অস্ত্রের ঘাটতি।
রাশিয়া বেশি ড্রোন তৈরি করছে এবং ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করছে।
ইউরোপের অর্থনীতি রাশিয়ার তুলনায় দশ গুণ বড়—চাইলেই ইউক্রেনকে বহু বছরের উদার সহায়তায় উদ্ধার করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইউরোপ অত্যন্ত ধীর।
মাত্র এক মাস আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৪০ বিলিয়ন ইউরোর রুশ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্তে একমত হতে ব্যর্থ হয়েছে।
যদি ইউরোপ ব্রাসেলসের ধীরগতিতে চলে, সাহায্য পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে—আর ইউক্রেনকে রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়বে।
#ইউক্রেন_যুদ্ধ #রাশিয়া #মার্কিন_রাজনীতি #ট্রাম্প #ইউরোপ #কূটনীতি
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















